![]()
আহমেদ তোফায়েল
একটি দেশে প্রতিবছর ২০ লাখ নতুন মানুষ কাজের বাজারে আসছেন। অথচ তাঁদের জন্য নতুন কাজ তৈরি হচ্ছে মাত্র ৯ লাখের মতো। তাহলে বাকি ১১ লাখ মানুষ কোথায় যাচ্ছেন? কেউ হয়তো বেকার থাকছেন, কেউ অনানুষ্ঠানিক কাজে ঢুকছেন, কেউ স্বল্প আয়ের কাজে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছেন, আবার কেউ হয়তো দেশ ছাড়ার পথ খুঁজছেন।
এই একটি হিসাবই বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে থাকা বড় বৈপরীত্যটি তুলে ধরে। একদিকে প্রবৃদ্ধির গল্প, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সংকট। অর্থনীতি বড় হচ্ছে, কিন্তু সেই বড় হওয়ার সঙ্গে মানুষের কাজের সুযোগ একই গতিতে বাড়ছে না।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে বছরে গড়ে প্রায় ৯ লাখ নতুন কাজ তৈরি হয়েছে। অথচ একই সময়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন প্রায় ২০ লাখ মানুষ। অর্থাৎ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি শ্রমবাজারে পর্যাপ্ত নতুন দরজা খুলতে পারছে না। এখানেই প্রশ্নটি আরও গভীর। প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি কার জন্য?
সংখ্যার ভেতরে যে গল্প
বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ হারে বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধি নিয়ে স্বস্তির কারণ আছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধির নিচে যদি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হয়, তাহলে তার সুফল সবার ঘরে সমানভাবে পৌঁছায় না। নতুন কাজের প্রতি ১০টির প্রায় ৭টিই তৈরি হয়েছে কৃষিতে। অথচ অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের স্বাভাবিক পথ হলো—মানুষ ধীরে ধীরে কৃষি থেকে শিল্প ও সেবায় যাবে। সেখানে বেশি উৎপাদনশীল কাজ তৈরি হবে, আয় বাড়বে, দক্ষতা বাড়বে। বাংলাদেশে সেই রূপান্তর প্রত্যাশিত গতিতে হচ্ছে না।
বরং শিল্প খাতে কর্মসংস্থান কমেছে। সেবা খাতেও একই সময়ে কর্মসংস্থানের চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতির যে দুটি খাতকে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের বড় ভরসা হিসেবে দেখা হয়, সেখানেই কাজ তৈরির গতি দুর্বল। এটি শুধু চাকরির হিসাব নয়। এটি অর্থনীতির কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন।
নারীর জন্য দরজাটি আরও সরু
কর্মসংস্থানের এই সংকট নারীদের ক্ষেত্রে আরও প্রকট। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সময়ে কৃষিতে নারীদের জন্য ৪২ লাখ নতুন কাজ তৈরি হলেও শিল্পে ১১ লাখ এবং সেবা খাতে ৮ লাখ কাজ কমেছে। একই সময়ে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে। একটি অর্থনীতি যখন আধুনিক হয়, তখন নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ সাধারণত বাড়ার কথা। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে উল্টো ছবি।
কৃষিতে কাজ বাড়ছে, কিন্তু শিল্প ও সেবায় নারীর জন্য সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। এর অর্থ হলো, নারীদের জন্য তুলনামূলক স্থিতিশীল ও উৎপাদনশীল কাজের বাজার যথেষ্ট দ্রুত তৈরি হচ্ছে না।
বাংলাদেশের ব্যবসা কাঠামোর আরেকটি বৈপরীত্য আরও বেশি ভাবনার। উৎপাদনশীলতার দিক থেকে শীর্ষ ১০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক খাতের মোট বিক্রির প্রায় ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। অথচ আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে তাদের অংশ মাত্র ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের সবচেয়ে উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল ব্যবসা করছে, কিন্তু সেই অনুপাতে চাকরি তৈরি করছে না।
অন্যদিকে অধিকাংশ কর্মসংস্থান তৈরি করছে ছোট ও তুলনামূলক কম উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান। এখানে অর্থনীতির জন্য একটি বড় শিক্ষা আছে। শুধু বড় প্রতিষ্ঠানকে আরও বড় করলেই কর্মসংস্থানের সমস্যার সমাধান হবে না। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। কারণ আগামী দিনের লাখ লাখ চাকরির সম্ভাবনা হয়তো আজকের ছোট কারখানা, দোকান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, সেবা উদ্যোগ কিংবা তরুণ উদ্যোক্তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
ব্যবসা বড় হওয়ার জন্য মূলধন দরকার, প্রযুক্তি দরকার, বাজার দরকার। কিন্তু তার আগে দরকার সহজ পরিবেশ।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপকদের গড়ে ১৩ শতাংশ সময় সরকারি নিয়মকানুন সামলাতেই চলে যায়। চট্টগ্রামে এই সময় প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বরিশালে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত।
একজন উদ্যোক্তা যদি ব্যবসা বাড়ানোর বদলে অনুমোদন সংগ্রহেই সময় ব্যয় করেন, তাহলে নতুন বিনিয়োগ আসবে কীভাবে? এর সঙ্গে আছে বিদ্যুৎ-বিভ্রাট। প্রতিবেদনের হিসাবে, ৭১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের মুখে পড়ে। এতে বার্ষিক বিক্রির প্রায় ৯ শতাংশ ক্ষতি হয়।
একজন বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য এই ক্ষতি সামলানো সম্ভব হতে পারে। কিন্তু ছোট উদ্যোক্তার জন্য কয়েক মাসের এমন ক্ষতিই ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার কারণ হতে পারে।
প্রবৃদ্ধির নতুন সংজ্ঞা দরকার
বাংলাদেশ এত দিন প্রবৃদ্ধির দিকে তাকিয়ে অর্থনীতির সাফল্য মেপেছে। এখন সময় এসেছে আরেকটি সংখ্যা সামনে রাখার—কত মানুষের কাজ হয়েছে?
সরকারি প্রণোদনা কতটা উৎপাদন বাড়াল, তার সঙ্গে এটিও দেখা দরকার কতটি নতুন চাকরি তৈরি হলো। কোনো করছাড় কতটা বিনিয়োগ বাড়াল, তার পাশাপাশি দেখতে হবে নতুন কতজন কর্মী যুক্ত হলো। কোনো শিল্প খাত কতটা রপ্তানি আয় করল, তার সঙ্গে জানতে হবে সেই খাতে কর্মসংস্থান কতটা বাড়ল।
অর্থনীতির নীতিতে তাই ‘বড় হওয়া’ এবং ‘কাজ তৈরি করা’—দুটিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ কমে এসেছে।
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি কঠিন বাস্তবতা। প্রতিবছর ২০ লাখ মানুষ কাজের বাজারে আসছেন। তাঁদের জন্য যদি কাজ তৈরি হয় মাত্র ৯ লাখ, তাহলে প্রবৃদ্ধির গল্পের বাইরে আরও একটি গল্প লিখতে হবে—কাজ না পাওয়ার গল্প।
এই গল্প বদলাতে হলে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানকে বড় হওয়ার পথ খুলতে হবে। ব্যবসার অনুমোদন সহজ করতে হবে। অর্থায়ন সহজ করতে হবে। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ দিতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, বিনিয়োগের সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্ককে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে জিডিপির সংখ্যা সরাসরি পৌঁছায় না। পৌঁছায় একটি চাকরি, একটি আয়, একটি ব্যবসা, একটি নতুন সুযোগ।
অর্থনীতির আকাশে প্রবৃদ্ধির সূর্য যতই উজ্জ্বল হোক, মানুষের ঘরে যদি কাজের আলো না পৌঁছায়, সেই আলো পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নের আলো নয়। বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক প্রশ্ন তাই—অর্থনীতি কত বড় হবে, তা নয়; এই অর্থনীতি কত মানুষের জন্য কাজ তৈরি করবে।
লেখক: বিজনেস এডিটর, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ।
সাবেক কর্মস্থল: দৈনিক যায়যায়দিন, বর্তমান, দেশ রূপান্তর ও দৈনিক ইত্তেফাক
পাঠকের মন্তব্য