![]()
আহমেদ তোফায়েল
ঠিক দুপুর তিনটায় যখন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তাঁর জীবনের প্রথম বাজেট বক্তৃতা শুরু করলেন, তখন ঢাকার কারওয়ান বাজারের এক চায়ের দোকানে স্তব্ধ হয়ে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন বছর ছাব্বিশের তরুণ ফাহিম। কম্পিউটার সায়েন্স থেকে পাস করে দুই বছর ধরে একটা ভালো চাকরির খোঁজে জুতোর তলা ক্ষয় করেছেন তিনি। গত কয়েক মাস ধরে চেষ্টা করছেন বন্ধুদের সাথে মিলে একটা ছোট তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ খোলার। কিন্তু পুঁজির অভাব, ব্যাংকের কঠোর শর্ত আর বাজারের উচ্চ মূল্যস্ফীতি তাঁর সেই স্বপ্নকে বারবার থমকে দিচ্ছিল।
অর্থমন্ত্রী যখন তাঁর পৌনে চার ঘণ্টার দীর্ঘ বক্তৃতায় ফ্রিল্যান্সার, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর আর নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য করছাড় ও শুল্কমুক্ত সুবিধার ঘোষণা দিচ্ছিলেন, তখন ফাহিমের চোখে এক চিলতে আলোর ঝলকানি দেখা গেল। কিন্তু ঠিক তার পরক্ষণেই যখন খুচরা বিক্রেতাদের ওপর অগ্রিম কর আর ব্যাংক হিসাব খুলতে বাধ্যতামূলক টিআইএন -এর ঘোষণা এলো, তখন পাশে বসা মুদি দোকানি রহমত মিয়ার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো।
বাস্তবতার এই দুই পিঠ নিয়েই মূলত আবর্তিত হচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট। মার্কিন ইতিহাসবিদ ও খ্যাতিমান মোটিভেশনাল স্পিকার চার্লস এ বিয়ার্ড-এর একটি বিখ্যাত উক্তি এখানে প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন, ‘বাজেট হলো একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মধ্যে সাজানো মানুষের আকাঙ্ক্ষা। বাজেট মানে কেবল খরচ কমানো নয়; বরং উপার্জিত অর্থকে সঠিক নিয়মে, সঠিক জায়গায় ব্যবহারের একটি দূরদর্শী পরিকল্পনা’। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক পটভূমিতে, দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে সর্বমহলে এটি নিয়ে গভীর কৌতূহল ছিল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের এবং অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এই প্রথম বাজেটটি কেবল একটি বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার এক উচ্চাভিলাষী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপরেখা।
এবারের বাজেটের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’। বাজেটটির ভেতরের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁর স্বল্পকালীন শাসনে উৎপাদনমুখী স্বনির্ভর অর্থনীতি, বাণিজ্য উদারীকরণ এবং বেসরকারিকরণের যে ধারা শুরু করেছিলেন, তারই একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক সংস্করণ দাঁড় করাতে চাচ্ছেন তাঁর উত্তরসূরি তারেক রহমান। বিগত বছরের মূল বাজেট থেকে প্রায় ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ বড় আকারের এই বাজেট ঘোষণা দিয়ে সরকার মূলত একটি বার্তা দিতে চেয়েছে—অর্থনীতির চাকা সচল করতে হলে ব্যয়ের পরিধি বাড়াতে হবে, যা প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে।
![]()
বাজেটের সবচেয়ে ইতিবাচক ও আধুনিক দিকটি হলো ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতির ওপর জোর দেওয়া। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এখন আর কেবল সনাতনী চাকরির পেছনে ছুটছে না। আউটসোর্সিং, কন্টেন্ট ক্রিয়েশন, চলচ্চিত্র ও সংগীতের মতো সৃজনশীল খাতে লাখ লাখ তরুণ নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করছে। এই খাতের প্রযুক্তিগত সামগ্রীতে কর ও শুল্ক ছাড় তরুণদের শুধু তুষ্টই করবে না, বরং আত্মসংস্থানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এ ছাড়া, স্বাস্থ্য খাতে ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধের কাঁচামাল আমদানি, হার্টের রিং ও কিডনি ডায়ালাইসিসের ফিল্টারে ভ্যাট ও শুল্ক প্রত্যাহার সরকারের ‘মানবিক’ ইশতেহারেরই প্রতিফলন। ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ থেকে বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ টাকা করা মধ্যবিত্তের জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তির।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠটি বেশ ধূসর এবং উদ্বেগের। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজেটের বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা অনেক অর্থনীতিবিদের চোখেই অবাস্তব এবং আকাশছোঁয়া। বিশেষ করে যেখানে বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঘাটতি ছিল প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা, সেখানে আগামী এক বছরে এনবিআরকে একাই তুলতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে করের যে জাল সম্প্রসারণ করা হচ্ছে, তা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়ায় কি না, সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সবচেয়ে বিতর্কিত এবং মাঠপর্যায়ে ভোগান্তি তৈরি করতে পারে এমন সিদ্ধান্ত হলো—যেকোনো ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন বাধ্যতামূলক করা। যদিও শিক্ষার্থী বা সামাজিক ভাতার হিসাবগুলোকে এর বাইরে রাখা হয়েছে, তবুও দেশের ১৭ কোটির বেশি ব্যাংক হিসাবের ওপর এর এক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়বে। গ্রামীণ অঞ্চলের যেসব প্রবাসী পরিবার কেবল রেমিট্যান্সের টাকা তোলার জন্য ব্যাংকে হিসাব খোলেন, যাদের কর দেওয়ার মতো কোনো আয় নেই, তাদেরকেও এখন এই আইনি মারপ্যাঁচের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। একইভাবে দেশের প্রায় ৭০ লাখ খুচরা বিক্রেতার ওপর পণ্য কেনার সময় দশমিক ২ শতাংশ অগ্রিম কর আরোপের সিদ্ধান্ত নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে মূল্যের চাপ তৈরি করতে পারে। পরিবেশক বা সরবরাহকারীরা এই করের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার পকেট থেকেই কেটে নেবে, যা বর্তমান ৯.৪ শতাংশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলতে পারে।
বাজেটের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতি—২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হবে। ব্যাংক খাত থেকে যখন সরকার নিজেই বিশাল অঙ্কের ঋণ শুষে নেবে, তখন বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হতে বাধ্য। ফলে নতুন উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ পেয়ে ব্যবসা বড় করার যে স্বপ্ন দেখছেন, তা পুঁজিবাজার বা আর্থিক খাতের সংস্কার ছাড়া আলোর মুখ দেখবে না।
আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, আগামী অর্থবছরে কেবল অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই সরকারের ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা, যা একটি বাধ্যতামূলক এবং অনুৎপাদনশীল খাত। এই বিশাল পরিমাণ টাকা যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহার করা যেত, তবে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হতো। যদিও বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ বরাদ্দের দিক থেকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলে—এই দুই মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত ধীর এবং দুর্নীতিগ্রস্ত। টাকার অঙ্কে বড় বরাদ্দ দিলেই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের গুণগত পরিবর্তন আসে না, যদি না প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়।
সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য ধাপে ধাপে সমন্বয়ের যে নীতি আইএমএফ-এর শর্তানুযায়ী সরকার গ্রহণ করছে, তাতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা এক প্রকার জাদুকরি চ্যালেঞ্জ হবে। কৃচ্ছ্রসাধন নীতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার যে ঘোষণা অর্থমন্ত্রী দিয়েছেন, তার সাথে রাজস্ব আদায়ের বাস্তব গতির সামঞ্জস্য না থাকলে সামষ্টিক অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।
বাজেটের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যসমূহকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ না বাড়িয়ে অর্থনীতিকে টেকসই করতে নিম্নলিখিত চারটি পদক্ষেপ দ্রুত গ্রহণ করা প্রয়োজন:
১. সাধারণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে কর-প্রশাসনের পূর্ণ অটোমেশন নিশ্চিত করতে হবে। কর ফাঁকি রোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কর অব্যাহতির সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে বড় বড় করপোরেট ও ধনীদের করের আওতায় আনতে হবে। ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে প্রান্তিক মানুষের টিআইএন নীতি পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
২. উন্নয়ন বাজেট বা এডিপির পূর্ণ এবং মানসম্মত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণ বন্ধ করে, যেসব প্রকল্প দ্রুত উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে (বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্পগুলো), সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
৩. ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে আনতে হবে যাতে বেসরকারি খাত বঞ্চিত না হয়। নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তার সুফল যেন ভোক্তারা পায় সেজন্য বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে। টিসিবি এবং ফ্যামিলি কার্ডের আওতা তৃণমূল পর্যায়ে স্বচ্ছতার সাথে বাড়াতে হবে।
৪. খেলাপি ঋণ আদায় এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরাতে একটি স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠন করা জরুরি। পুঁজিবাজারকে গতিশীল ও স্বচ্ছ করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল না থেকে সহজে মূলধন সংগ্রহ করতে পারেন।
পরিশেষে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি নিঃসন্দেহে একটি ক্রান্তিকালের বাজেট। এতে যেমন তরুণদের ডানা মেলার আকাশ দেওয়ার চেষ্টা আছে, তেমনি আছে রাজস্ব আদায়ের কঠিন খাঁচাও। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বা উন্নয়ন দর্শন তখনই সফল হবে, যখন এই পরিকল্পনা কেবল কাগজের ৯৭ পৃষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সাধারণ মানুষের পকেটে স্বস্তি এবং টেবিলে খাবার নিশ্চিত করতে পারবে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জনগণের শক্তি, সৃজনশীলতা ও উদ্যোগকে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই মানবসম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল একটি স্বনির্ভর ও মর্যাদাবান বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব—অন্যথায় বিশাল বাজেটের ঘাটতির খতিয়ান আমজনতার জন্য কেবলই সংখ্যার এক গোলকধাঁধা হয়ে থাকবে।