![]()
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ঘিরে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ও বিতর্ক বাড়ছে। একদিকে সাধারণ মানুষ চাকরি হারানোর আশঙ্কায় আতঙ্কিত, অন্যদিকে প্রযুক্তি কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারাই এআই-এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সতর্ক বার্তা দিচ্ছেন—আবার কেউ কেউ বলছেন, এটি নতুন সুযোগও তৈরি করবে।
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে অনেক মানুষ মনে করছেন আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে চাকরি হারানোর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। ২০০৭-০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময়ের তুলনায় এই উদ্বেগ অনেক বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী ডারিও অ্যামোদেই সতর্ক করেছেন যে এআই বেকারত্বের হার ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসও মন্তব্য করেছেন, ভবিষ্যতে অনেক কাজে মানুষের প্রয়োজন কমে যেতে পারে। তবে ওপেনএআই প্রধান স্যাম অল্টম্যান তুলনামূলকভাবে ভিন্ন অবস্থান নিয়ে বলেছেন, এআই মূলত মানুষের সহায়ক প্রযুক্তি, যা কাজকে সহজ করবে—পুরোপুরি প্রতিস্থাপন নয়।
তবে অর্থনীতিবিদদের বড় অংশ এই উদ্বেগকে অতিরঞ্জিত মনে করছেন। তাদের মতে, প্রযুক্তি সাধারণত কর্মসংস্থান ধ্বংসের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি করে। কোনো খাত থেকে চাকরি কমলেও অন্য খাতে চাহিদা তৈরি হয়, যা অর্থনীতিকে সামগ্রিকভাবে ভারসাম্যে রাখে।
পরিসংখ্যানও আপাতত বড় ধরনের চাকরি সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে না। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে কর্মসংস্থানের হার এখনো উচ্চ, আর বেকারত্ব তুলনামূলকভাবে কম। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে কয়েক মিলিয়ন নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে।
ঐতিহাসিক উদাহরণও এই যুক্তিকে সমর্থন করে। কৃষি, শিল্প ও প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সময় বহু পেশা বিলুপ্ত হলেও দীর্ঘমেয়াদে নতুন শিল্প, নতুন কাজ ও উচ্চতর উৎপাদনশীলতা তৈরি হয়েছে। তবে এসব পরিবর্তন সাধারণত ধীরগতিতে ঘটায় শ্রমবাজার বড় ধরনের ধাক্কা সামলাতে সক্ষম হয়েছে।
ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রযুক্তির প্রভাব কখনোই সরলভাবে “চাকরি কমানো” বা “বাড়ানো”-র মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং উৎপাদনশীলতা, জীবনযাত্রার ব্যয়, মজুরি ও নীতিনির্ধারণ—সব মিলিয়ে একটি জটিল ভারসাম্য তৈরি করেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি এআই সত্যিই বড় ধরনের পরিবর্তন আনে, তবে তা ধরা পড়বে উৎপাদনশীলতা দ্রুত বাড়লেও প্রকৃত মজুরি তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা এবং নির্দিষ্ট কিছু খাতে ব্যাপক চাকরি পরিবর্তনের মাধ্যমে। তবে এমন পরিস্থিতিও সাধারণত অর্থনৈতিক মন্দার সময় আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।
সব মিলিয়ে, এআই কি সত্যিই ব্যাপক বেকারত্ব সৃষ্টি করবে, নাকি নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের পথ খুলবে—তা এখনো নিশ্চিত নয়। অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা একমত যে, এর প্রকৃত প্রভাব বোঝার জন্য আরও সময় এবং বাস্তব পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ জরুরি।
পাঠকের মন্তব্য