![]()
ঢাকার সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থায় একাধিক সরকারি সংস্থা আলাদা আলাদাভাবে কাজ করলেও তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সিটি করপোরেশন, রাজউক, সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর, সেতু কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ রেলওয়ে, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রাজধানীর সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে। একইভাবে যানবাহনের নিবন্ধন ও ফিটনেস দেখভাল করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), আর ওয়াসা, তিতাস ও ডেসকোর মতো ইউটিলিটি সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময়ে রাস্তা খননের কাজ করে থাকে।
সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত ‘ঢাকার যানজট নিরসন’ সংক্রান্ত এক সভায় জানানো হয়, রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অন্তত ২০টির বেশি সংস্থা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। তবে এসব সংস্থার মধ্যে কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই। এই বাস্তবতায় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে (ডিটিসিএ) আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, যাতে সংস্থাটিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীনে আনা যায়।
অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বয়ের অভাবে রাজধানীর নাগরিক সেবায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকায় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সুফল দিচ্ছে না। একই সঙ্গে যানজটের কারণে নাগরিকদের সময় ও অর্থ দুটোই অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন সংস্থা আলাদা আলাদা সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সড়কের সক্ষমতা এবং যানবাহনের সংখ্যার মধ্যে কোনো বৈজ্ঞানিক ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে না।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান মনে করেন, এই সমন্বয়হীনতা শহর ব্যবস্থাপনায় বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার ঘাটতি তৈরি করেছে। তাঁর মতে, একদিকে সিটি করপোরেশন ও রাজউক রাস্তা তৈরি করছে, অন্যদিকে বিআরটিএ যানবাহন নিবন্ধন দিচ্ছে, আবার অন্য সংস্থা আমদানি অনুমোদন দিচ্ছে—এই তিন স্তরের সিদ্ধান্তের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই, ফলে পুরো পরিবহন ব্যবস্থাই অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
ঢাকার যানজট নিরসনে ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল ও এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার মূল কারণ অবকাঠামো নয়, বরং প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা। বিশ্বের বড় শহরগুলোতে যেখানে একটি শক্তিশালী একক পরিবহন কর্তৃপক্ষ কাজ করে, সেখানে ঢাকায় দায়িত্ব ছড়িয়ে আছে একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে।
২০১২ সালে গঠিত Dhaka Transport Coordination Authority (ডিটিসিএ) মূলত এসব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করার জন্য তৈরি হলেও বাস্তবে তাদের কোনো কার্যকর ক্ষমতা নেই। সংস্থাটি মূলত একটি পরামর্শক ভূমিকা পালন করছে এবং বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্য সংস্থার ওপর এর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার ডিটিসিএকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়েছে। সাম্প্রতিক এক সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, সংস্থাটিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীনে ন্যস্ত করার বিষয়ে পর্যালোচনা করা হবে, যাতে এটি আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ডিটিসিএর পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলিত করতে সংস্থাটিকে আইনি ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়া জরুরি। তাদের মতে, রুট অনুমোদন, অবৈধ বাস নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবহন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যদি ডিটিসিএকে শক্তিশালী করা যায়, তাহলে ঢাকার যানজট ও অব্যবস্থাপনা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
পাঠকের মন্তব্য