![]()
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেই গত সপ্তাহজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ছিল অস্বাভাবিক উচ্ছ্বাস। প্রধান সূচক এসঅ্যান্ডপি ৫০০ টানা তৃতীয়বারের মতো রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, আর প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক কম্পোজিট ১৯৯২ সালের পর সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।
এই উত্থানের পেছনে মূল চালিকা শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ পুনরায় চালুর সম্ভাবনাকে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, তেল সরবরাহে বড় ধাক্কা হয়তো কেটে গেছে এবং সংঘাত আর বড় আকারে ছড়াবে না। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ কমবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর অপরিশোধিত তেলের দামও কমতে শুরু করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ঘোষণা দেন, যুদ্ধবিরতির সময় হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খোলা থাকবে। এর পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে এবং শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা জোরদার হয়।
বিশ্ববাজারের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড-এর দাম ৯ দশমিক ০৭ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৯০ দশমিক ৩৮ ডলারে নেমে আসে, যা ১০ মার্চের পর সর্বনিম্ন। একই সময়ে ডাউ জোনস সূচক ৮৬৯ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেড়ে যুদ্ধ শুরুর পরের ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইসরায়েল ও লেবানন ১০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। যদিও সংঘাতের ভবিষ্যৎ ও হরমুজ প্রণালির স্থিতিশীলতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, তবুও বাজারে এর খুব একটা প্রভাব পড়ছে না।
কেন চাঙা বাজার?
গত মার্চের শেষের পতনের পর থেকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্থানের পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে—যুদ্ধবিরতির স্বস্তি, তেলের দাম কমে যাওয়া, কোম্পানিগুলোর ভালো আয়ের পূর্বাভাস এবং প্রযুক্তি খাতের ঘুরে দাঁড়ানো।
ট্রুইস্ট অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের কৌশলবিদ কিথ লার্নার বলেন, বাজারের প্রত্যাশা আগেই কমে গিয়েছিল, বিনিয়োগকারীরা আরও খারাপ পরিস্থিতির আশঙ্কা করছিলেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো হওয়ায় বাজার দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া প্রযুক্তিগত কারণেও এই উত্থান ত্বরান্বিত হয়েছে। বাজারে অস্থিরতা কমে গেলে অ্যালগরিদম-নির্ভর স্বয়ংক্রিয় শেয়ার কেনা শুরু হয়, যাকে ‘ফোর্সড বায়িং’ বলা হয়—এটিও বাজারকে আরও ওপরে তুলেছে।
‘ভয়’ থেকে ‘লোভে’ বিনিয়োগকারীরা
গত এক বছরে ওয়াল স্ট্রিটে একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে—বাজার পড়লে বিনিয়োগকারীরা ধরে নেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ঝুঁকিপূর্ণ নীতি থেকে সরে আসবেন। ফলে পতনকে তারা কেনার সুযোগ হিসেবে দেখেন।
তবে ইরান-সংঘাত এই ধারণাকে কিছুটা জটিল করেছে। কারণ, যদি ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সহজে পিছিয়ে আসা কঠিন হবে। তবুও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সংঘাত প্রশমনের ইঙ্গিত পাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা আশাবাদী।
ইন্টারেক্টিভ ব্রোকার্সের কৌশলবিদ স্টিভ সসনিক বলেন, বাজারে এখন একধরনের ‘মিস করার ভয়’ কাজ করছে, যা বিনিয়োগকারীদের আরও ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত করছে। তার মতে, এই প্রবণতার আড়ালে লুকিয়ে আছে লোভ।
সিএনএন-এর ফিয়ার অ্যান্ড গ্রিড ইনডেক্স গত মার্চে ‘চরম ভয়’ পর্যায়ে থাকলেও এখন ‘লোভ’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকি নিচ্ছেন।
সামনে ঝুঁকি রয়ে গেছে
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, বাজার হয়তো সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলোকে উপেক্ষা করছে। ম্যান গ্রুপের কৌশলবিদ ক্রিস্টিনা হুপার বলেন, বাজার এখন সামান্য ইতিবাচক খবরেই দ্রুত বাড়ছে, নেতিবাচক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানির উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি করছে। ফলে বাস্তব অর্থনীতি (মেইন স্ট্রিট) এবং শেয়ারবাজারের (ওয়াল স্ট্রিট) মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতির আশায় শেয়ারবাজারে স্বস্তি ফিরে এলেও অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পাঠকের মন্তব্য