![]()
চট্টগ্রাম বন্দরে ডিজেল সংকট প্রকট আকার ধারণ করায় লাইটার (পণ্যবাহী ছোট জাহাজ) চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে বহির্নোঙরে থাকা বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং দেশজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ তৈরি হয়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে পণ্য পরিবহন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানির বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একাধিক সমন্বয় সভা ও আবেদন সত্ত্বেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এখনো কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিপিসির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, তারা গত বছরের চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছর আমদানি বেড়ে যাওয়ায় জাহাজ চলাচলও বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় লাইটার জাহাজ পরিচালনায় বিলম্ব হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি পরিদর্শনকালে জানান, এপ্রিল ও মে মাসের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং জুন পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এর আগে বলেছেন, সংকটের মূল কারণ জ্বালানির ঘাটতি নয়, বরং লজিস্টিকস ও ব্যবস্থাপনাগত জটিলতা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়াও এ পরিস্থিতির পেছনে ভূমিকা রাখছে।
ধীরগতি পণ্য খালাস, বাড়ছে ব্যয়
ডিজেল সংকটের কারণে পণ্য খালাসের গতি অস্বাভাবিকভাবে ধীর হয়ে গেছে। যেখানে সাধারণত ১৫ দিনের মধ্যে খালাস শেষ হওয়ার কথা, সেখানে এখন প্রায় এক মাস সময় লাগছে। এতে প্রতিটি জাহাজের জন্য আমদানিকারকদের ৩ লাখ ডলার পর্যন্ত বিলম্ব মাশুল (ডেমারেজ) গুনতে হচ্ছে।
কয়লা খালাসেও এর প্রভাব পড়েছে। আগে যে কাজ ৩২ থেকে ৩৮ ঘণ্টায় সম্পন্ন হতো, এখন তা করতে ৮ থেকে ১০ দিন লাগছে। ফলে বন্দরের বহির্নোঙরে জাহাজের দীর্ঘ জট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ক্লিংকার, খাদ্যশস্য ও পোল্ট্রি ফিডসহ প্রায় ৮০টি বড় জাহাজ অপেক্ষায় রয়েছে।
অলস জাহাজ, বাড়ছে লোকসান
জ্বালানি সংকটে অনেক জাহাজ অলস পড়ে থাকায় জাহাজ মালিকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিটি জাহাজ অলস থাকলে দিনে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।
শিপিং খাতের প্রতিনিধিরা জানান, প্রয়োজনের তুলনায় লাইটার জাহাজ কম পাওয়া যাচ্ছে এবং জ্বালানি সংকটের কারণে যেগুলো পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোরও সময়মতো চলাচল সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিলম্ব মাশুল ও পরিবহন ব্যয় বাড়ছে।
বিদ্যুৎ খাতেও প্রভাবের আশঙ্কা
এই সংকটের প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতেও পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ আমদানিকৃত কয়লার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কয়লা পরিবহনে বিলম্ব হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
দ্রুত সমাধানের দাবি
বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি)-এর মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ সতর্ক করে বলেন, জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে পুরো লজিস্টিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। এতে বিদেশি জাহাজ বাংলাদেশে আসতে নিরুৎসাহিত হবে।
শিপিং অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর শফিউল বারীও সংকটের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, একটি ট্রিপ সম্পন্ন করতে যেখানে ৩ থেকে ৪ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন, সেখানে ডিলাররা দিচ্ছেন মাত্র ১,৫০০ থেকে ২,০০০ লিটার। ফলে জাহাজগুলো মাঝপথেই থেমে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বাণিজ্য প্রবাহ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে।
পাঠকের মন্তব্য