![]()
১৯৭০-এর দশকে স্বর্ণমান ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন এক কাঠামো গড়ে ওঠে, যা পরিচিত ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থা নামে। হেনরি কিসিঞ্জার-এর মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব-এর মধ্যে হওয়া এক সমঝোতার ফলে তেল বাণিজ্য ডলারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
তবে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, বিশেষ করে ইরান-কে কেন্দ্র করে সংঘাত এবং চীন-এর ‘পেট্রো-ইউয়ান’ উদ্যোগ এই ব্যবস্থার ভিত নড়বড়ে করে তুলছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই ডলারের আধিপত্য ধীরে ধীরে ক্ষয় হচ্ছিল, আর বর্তমান পরিস্থিতি সেই দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ নিয়ে উত্তেজনা বিশ্ববাণিজ্যে ডলারের ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭৪ সালের পর থেকে তেল বাণিজ্যে ডলার ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা বিশ্বজুড়ে ডলারের চাহিদা বাড়িয়ে তোলে। তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো তাদের আয়ের বড় অংশ মার্কিন সম্পদে বিনিয়োগ করতে শুরু করে, ফলে একটি শক্তিশালী আর্থিক চক্র তৈরি হয়। কিন্তু বর্তমানে সেই চক্রে ফাটল দেখা যাচ্ছে। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ হিসেবে ডলারের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, আর অনেক দেশ বিকল্প মুদ্রায় বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকছে।
বিশেষ করে চীন কৌশলগতভাবে ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। তারা তেল বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়াচ্ছে এবং বিকল্প আর্থিক অবকাঠামো গড়ে তুলছে। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোও এখন বাণিজ্য অংশীদারদের বৈচিত্র্য আনছে, যা পেট্রোডলারের একচেটিয়া প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে।
এদিকে রাশিয়া, ইরানসহ বিভিন্ন দেশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ডলারনির্ভরতা কমানোর পথ বেছে নিচ্ছে। এর ফলে ‘ডি-ডলারাইজেশন’ প্রবণতা আরও জোরদার হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ইরান সংশ্লিষ্ট সংঘাত এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে একটি নতুন মুদ্রা ভারসাম্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তবে এখনও ডলারের আধিপত্য পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। আন্তর্জাতিক লেনদেনের বড় অংশ এখনও ডলারে সম্পন্ন হয় এবং এটি বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবেই রয়েছে। ‘পেট্রো-ইউয়ান’ একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে উঠে এলেও ডলারের সমকক্ষ হতে হলে তাকে আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
পাঠকের মন্তব্য