![]()
বাংলাদেশে হাম রোগের পরিস্থিতির উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। প্রতিদিনই সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে।
গত ২৩ দিনে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মিলিয়ে মোট ১৪৯ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বর্তমানে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব চলছে এবং অভিভাবকদের উপসর্গ সম্পর্কে সচেতন থেকে সময়মতো টিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) পর্যন্ত চলতি বছরে নিশ্চিত হাম সংক্রমণে ২১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া সন্দেহভাজন রোগীদের মধ্যে আরও ১২৮ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় একজন নিশ্চিত এবং হাম-সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন আরও ১০ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। একই সময়ে হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে ১,২৩৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২২৪ জনের ক্ষেত্রে সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে।
১৫ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত পরীক্ষাগারে মোট ১,৩৯৮টি হাম সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১ জনে।
সামগ্রিকভাবে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৯,৮৮৩ জন এবং নিশ্চিত সংক্রমণ ৬,৮৮৩। এ পর্যন্ত ৪,৬৩৫ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
বিভাগভিত্তিক পরিস্থিতি
ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৪৯৯ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এরপর রাজশাহী (২২৫), চট্টগ্রাম (১৭৫), খুলনা (১০১), বরিশাল (৯৬), ময়মনসিংহ (৪৬), রংপুর (৫৪) ও সিলেট (৪০) বিভাগে রোগী পাওয়া গেছে।
নিশ্চিত সংক্রমণের ক্ষেত্রেও ঢাকা বিভাগ শীর্ষে, যেখানে ১৮৬টি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যাও ঢাকায় সবচেয়ে বেশি—২৫৬ জন। এরপর চট্টগ্রাম (১২৫) ও রাজশাহী (৯২)।
সন্দেহভাজন মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি রাজশাহী বিভাগে—৫৮টি, এরপর ঢাকায় ৫১টি। অন্যদিকে নিশ্চিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে ঢাকায় ৯ জন, বরিশালে ৫ জন, চট্টগ্রামে ২ জন এবং রাজশাহী ও ময়মনসিংহে ২ জন করে মারা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামকে হালকা রোগ মনে করার ভুল ধারণাই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
এভারকেয়ার হাসপাতাল ঢাকার শিশু ও নবজাতক রোগ বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. ফাহমিদা জাবীন জানান, হাম অত্যন্ত সংক্রামক এবং চিকিৎসা না হলে মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে। তিনি সময়মতো টিকাদান, আক্রান্তদের আলাদা রাখা, পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এবং দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
তার মতে, প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের হার অন্তত ৯৫ শতাংশে উন্নীত করা জরুরি এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজর দিতে হবে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে বলেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
তিনি জানান, সংক্রমণের এক থেকে দুই সপ্তাহ পর উপসর্গ দেখা দেয় এবং একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১৮ জন পর্যন্ত অন্যকে সংক্রমিত করতে পারেন।
প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে তীব্র জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া ও আলোতে অস্বস্তি দেখা দেয়। তিন থেকে চার দিন পর শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। এসব লক্ষণ দেখা দিলে শিশুকে দ্রুত আলাদা রাখা এবং শ্বাসকষ্ট হলে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
এছাড়া উপসর্গযুক্ত শিশুদের স্কুলে না পাঠানো, ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার দেওয়া এবং দ্রুত টিকা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
পাঠকের মন্তব্য