
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প ও দেশীয় জ্বালানি উৎসের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, জ্বালানি খাতে সৌরবিদ্যুৎ, পারমাণবিক বিদ্যুৎ ও কয়লার ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের নিজস্ব সম্পদ কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বিবার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারটির আয়োজন করে ডিসিসিআই।
অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরে দেশে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশের মজুদকৃত কয়লা উৎপাদনের বিষয়েও সরকার চিন্তাভাবনা করছে। তবে এ ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বার্থ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেই কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিপুল পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, স্থানীয় বিনিয়োগ সম্প্রসারিত না হলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন। তাই দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, প্রতিবন্ধকতা যত গভীরই হোক না কেন, সেগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। দেশের বেসরকারি খাতের বিকাশ ও বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।
ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা চ্যালেঞ্জ
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। তিনি বলেন, বাণিজ্য বাধা, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, সরবরাহব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়াকে অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। রপ্তানিতে লিডটাইম কমাতে শিল্পাঞ্চলগুলোতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সেবা নিরবচ্ছিন্নভাবে নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন ডিসিসিআই সভাপতি।
অর্থনীতি যুগসন্ধিক্ষণে: হোসেন জিল্লুর
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুগসন্ধিক্ষণে রয়েছে। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক গতি অর্জন করা কঠিন হবে।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় নামেনি। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দীর্ঘদিনের মধ্যে নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং শিল্প খাতের পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হতে না পারার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
উচ্চ সুদহার, উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নীতির বাস্তবায়নে ঘাটতি
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, দেশের নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। এ কারণে অনেক সিদ্ধান্তের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি রপ্তানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণের পাশাপাশি আমদানি নীতিতেও ভারসাম্য আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। উচ্চ শুল্কহার স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতি বাড়াতে ভূমিকা রাখছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সিপিডির সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের জন্য কর আহরণ বাড়াতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। বাজেটে ইতিবাচক কিছু উদ্যোগ থাকলেও মুদ্রানীতিতে তার যথাযথ প্রতিফলন নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির সংস্কারের ওপরও জোর দেন তিনি।
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের তাগিদ
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতে তারল্য বাড়ানোর পাশাপাশি বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, স্থানীয় বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আসবে না। এজন্য নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি লজিস্টিকস খাতের দুর্বলতা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ট্রান্সকম লিমিটেডের গ্রুপ সিইও সীমিন রহমান বলেন, বাজেটে ব্যবসাবান্ধব কিছু নীতি থাকলেও বেসরকারি খাতে প্রত্যাশিত গতি আসেনি। উচ্চ সুদহার ও মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং আর্থিক খাত থেকে সরকারের বেশি ঋণ গ্রহণকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
সেমিনারে ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি হোসেন খালেদ, আবুল কাসেম খান, বেনজীর আহমেদ, রিজওয়ান রাহমানসহ ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বক্তব্য দেন। আলোচনায় জ্বালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি, ঋণপ্রবাহ, রাজস্ব আহরণ এবং বেসরকারি খাতের বিকাশসহ দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে।
পাঠকের মন্তব্য