
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় প্রতিবেশী দেশগুলোকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরান। দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন প্রধান মহসেন রেজাই বলেছেন, কোনো প্রতিবেশী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ অংশ নিলে তাদের স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগর থেকে তেল পরিবহনের বিকল্প রুটে হামলার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।
শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন মহসেন রেজাই। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই ছিল তাঁর প্রথম দীর্ঘ ও বিস্তারিত প্রকাশ্য বক্তব্য।
রেজাই বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের উদ্যোগে সহযোগিতা করে, তাহলে তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে তেহরান। সে ক্ষেত্রে ওই দেশগুলোর স্বার্থও ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
মার্কিন অর্থনৈতিক স্বার্থে হামলার হুমকি
সাক্ষাৎকারে মহসেন রেজাই বলেন, চলমান সংঘাতের পরিস্থিতিতে ইরানের হাতে আরও অনেক কৌশলগত বিকল্প রয়েছে। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অর্থনৈতিক স্বার্থে হামলা চালানো হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান এখন পর্যন্ত মূলত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করেছে। তবে তেহরানের ওপর নতুন করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে ইরানের আশপাশসহ বিভিন্ন এলাকায় থাকা মার্কিন তেল কোম্পানি ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করা হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
মহসেন রেজাই এর আগে দীর্ঘ সময় ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ইরাক-ইরান যুদ্ধের অধিকাংশ সময় তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। চলতি মাসে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক পদগুলোতে একাধিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে তাঁকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান করা হয়।
ইরানকে বিচ্ছিন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগের ঘোষণা দেন। তেহরানকে সহযোগিতা বা তাদের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর জন্য ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’ বয়ে আনার হুমকি দেন তিনি।
ওয়াশিংটনের এই উদ্যোগের লক্ষ্য ইরানে অর্থপ্রবাহ কমানো এবং দেশটির অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ানো। এ পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও আর্থিক সম্পর্ক রাখা দেশগুলোর ওপরও মার্কিন চাপ বাড়ছে।
ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার চীন মার্কিন উদ্যোগের সমালোচনা করেছে। বেইজিংয়ের বক্তব্য, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কার্যকর সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, ইরানের অন্যতম বাণিজ্যিক অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাতও তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন করা হয়। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নতুন ভূখণ্ড’ হিসেবে দেখার কথা বলেছেন। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পারস্য উপসাগরের একটি মানচিত্র প্রকাশ করে হরমুজ প্রণালিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভূখণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের মধ্যেই ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার কাছ থেকে তেল পরিবহন রুট ও মার্কিন অর্থনৈতিক স্বার্থকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলার হুমকি এল।
ফলে ইরানের ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি হুমকি এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর অবস্থান—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য