![]()
বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠে আজ নতুন এক গল্প লেখা হচ্ছে—যে গল্পে উচ্চশিক্ষিত তরুণরা আবারও ফিরে যাচ্ছেন মাটির কাছে। এটি কোনো রোমান্টিক প্রত্যাবর্তন নয়, বরং বাস্তবতার কঠিন চাপে নেওয়া সিদ্ধান্ত। চাকরির বাজারে বারবার ব্যর্থ হয়ে অনেকেই এখন জীবিকার আশায় কৃষিকেই বেছে নিচ্ছেন।
যেখানে একসময় উচ্চশিক্ষাকে কৃষিকাজ থেকে বেরিয়ে আসার সোপান হিসেবে দেখা হতো, সেখানে আজ সেই ধারণা ভেঙে পড়ছে। দেশের অর্থনীতি কাগজে-কলমে শিল্পায়নের দিকে এগোলেও বাস্তবে কর্মসংস্থানের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। উৎপাদন ও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি থাকলেও কর্মসংস্থান কমছে—যা তৈরি করছে এক গভীর কাঠামোগত বৈপরীত্য।
এই বাস্তবতা উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল–এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধি হলেও তা ‘চাকরিহীন প্রবৃদ্ধি’ হিসেবে রয়ে গেছে। অর্থাৎ অর্থনীতি বাড়ছে, কিন্তু সেই বৃদ্ধির সুফল হিসেবে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
শিল্পের দিকে যাত্রা, কিন্তু চাকরি নেই
গত এক দশকে উৎপাদন খাত অর্থনীতিতে প্রায় ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে এই খাতে কর্মসংস্থান ২ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। সেবা খাতেও একই প্রবণতা—প্রবৃদ্ধি থাকলেও কর্মসংস্থান কমেছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ পয়েন্ট।
ফলে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে:
অর্থনীতি শিল্পায়িত হচ্ছে, কিন্তু মানুষ কাজের জন্য আবার কৃষির দিকেই ফিরে যাচ্ছে।
কৃষি: আশ্রয়, কিন্তু সমাধান নয়
কৃষিখাতের অবদান অর্থনীতিতে কমলেও (প্রায় ৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ পয়েন্ট), এই খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট। অর্থাৎ কৃষি এখন এক ধরনের ‘বাফার’—যেখানে কাজ না পাওয়া মানুষ আশ্রয় নিচ্ছেন।
কিন্তু এই আশ্রয়েরও সীমাবদ্ধতা আছে। কৃষিতে উৎপাদনশীলতা তুলনামূলক কম, ফলে দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই সমাধান হতে পারে না। বরং এটি লুকানো বেকারত্বকে বাড়িয়ে দেয়।
শিক্ষার সঙ্গে চাকরির অমিল
দেশে শিক্ষার হার দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী চাকরি তৈরি হচ্ছে না। এর ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী—
-
কম শিক্ষিতদের বেকারত্ব: ৩ দশমিক ০১ শতাংশ
-
উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্ব: ৮ দশমিক ৭ শতাংশ
-
২০২৪ সালে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব: প্রায় ২৫ শতাংশ
অর্থাৎ যত বেশি পড়াশোনা, তত বেশি বেকার থাকার ঝুঁকি—এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
শহরের তরুণদের হতাশা
সামগ্রিক বেকারত্বের হার কম (৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ) হলেও তরুণদের মধ্যে সংকট তীব্র।
-
তরুণ বেকারত্ব: ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ
-
শহরে: ১৩ দশমিক ২৭ শতাংশ
-
গ্রামে: ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ
শহরের শিক্ষিত তরুণরা চাকরি না পেয়ে সবচেয়ে বেশি হতাশার মধ্যে রয়েছেন। অনেকেই শেষ পর্যন্ত গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন—কেউ কৃষিকাজে, কেউ ছোট ব্যবসায়।
নারীদের জন্য আরও কঠিন বাস্তবতা
উচ্চশিক্ষিত নারীদের বেকারত্বের হার ১৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ—যা একই পর্যায়ের পুরুষদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে নারীরা কর্মসংস্থানে আরও বড় বাধার মুখোমুখি হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি মনে করেন, সমস্যাটি শুধু চাকরির সংখ্যায় নয়, বরং শিক্ষাব্যবস্থা ও শিল্পখাতের বিচ্ছিন্নতায়।
তার মতে,
‘শিক্ষার্থীরা যে ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন, তা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে মেলে না। ফলে একদিকে দক্ষ শ্রমিকের অভাব, অন্যদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে।’
অন্যদিকে মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, শিল্পখাতে বৈচিত্র্যের অভাব বড় সমস্যা। সীমিত কিছু খাতে প্রবৃদ্ধি হলেও সেখানে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
অটোমেশন: নতুন চ্যালেঞ্জ
উৎপাদন খাতে স্বল্প দক্ষতার কাজগুলো দ্রুত অটোমেশনের দিকে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে এই খাতে চাকরি আরও কমতে পারে। যদি এখনই দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে সংকট আরও গভীর হবে।
প্রবাসও আর সহজ পথ নয়
অনেকে প্রবাসে যাওয়াকে সমাধান হিসেবে ভাবলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেই সুযোগও সীমিত। ক্রমবর্ধমান শ্রমশক্তির জন্য বিদেশি শ্রমবাজার পর্যাপ্ত নয়।
সমাধানের পথ কোথায়?
বিশেষজ্ঞরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় তুলে ধরেছেন—
-
শিল্পখাতে বৈচিত্র্য বাড়ানো
-
উচ্চ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি
-
শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে সংযোগ তৈরি
-
দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ জোরদার
-
STEM শিক্ষার প্রসার
-
প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) বাড়ানো
এফডিআই বাড়লে নতুন প্রযুক্তি আসবে, শিল্প খাতে বৈচিত্র্য তৈরি হবে এবং তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
শেষ কথা
বাংলাদেশের তরুণরা হাল ছাড়েনি। তারা মাটিতে ফিরে যাচ্ছে—হয়তো বাধ্য হয়ে, কিন্তু বেঁচে থাকার জন্য। এই প্রত্যাবর্তন আমাদের জন্য সতর্কবার্তা—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনে।
যদি এখনই শিক্ষা, শিল্প ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি না করা যায়, তাহলে এই ‘মাটিতে ফেরা’ একদিন হয়তো বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংকেত হয়ে দাঁড়াবে।
পাঠকের মন্তব্য