![]()
বাংলাদেশের আর্থিক খাতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে সম্ভাব্য রদবদল। বাংলাদেশ ব্যাংক–এর নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান একজন জাঁদরেল বাণিজ্যিক ব্যাংক এমডিকে ডেপুটি গভর্নর পদে আনার বিষয়ে ভাবছেন—এমন আলোচনা ব্যাংকিং মহলে ছড়িয়ে পড়েছে।
যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবুও সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘিরে ইতোমধ্যেই নানা জল্পনা শুরু হয়েছে।
আলোচনায় দুই ব্যাংকার
ডেপুটি গভর্নরের সম্ভাব্য তালিকায় যাদের নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে, তারা হলেন—
-
মাসরুর আরেফিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিটি ব্যাংক
-
আলী রেজা ইফতেখার, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড
তবে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, এই পদে যোগ দেওয়ার বিষয়ে তাদের আগ্রহ খুব একটা নেই।
মাসরুর আরেফিন সরাসরি জানিয়েছেন, তার সঙ্গে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করেনি এবং তিনি এই মুহূর্তে ক্যারিয়ার পরিবর্তনের কথা ভাবছেন না।
অন্যদিকে আলী রেজা ইফতেখারের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে শিগগিরই, ফলে তাকে নিয়ে জল্পনা কিছুটা বেশি হলেও তার পক্ষ থেকেও কোনো স্পষ্ট অবস্থান জানা যায়নি।
কেন আগ্রহ কম?
ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যে প্রধান অনাগ্রহের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে তিনটি বিষয়—
১. বেতন ও সুবিধার পার্থক্য
বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডিরা যে উচ্চ বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর পদে তা তুলনামূলক অনেক কম। ফলে জীবনযাত্রার মানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার আশঙ্কা রয়েছে।
২. কাজের স্বাধীনতা নিয়ে সংশয়
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নীতিনির্ধারণী কাঠামো ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া তুলনামূলক বেশি নিয়ন্ত্রিত। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা কতটা থাকবে—তা নিয়েও অনেকেই সন্দিহান।
৩. কাজের ধরনে পার্থক্য
বাণিজ্যিক ব্যাংকের লক্ষ্য মুনাফা ও ব্যবসা সম্প্রসারণ, আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ নীতিনির্ধারণ, নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি। এই মৌলিক পার্থক্য অনেককে নিরুৎসাহিত করছে।
নতুন গভর্নরের প্রেক্ষাপট
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সরকার ড. আহসান এইচ মনসুর–কে অব্যাহতি দিয়ে মোস্তাকুর রহমানকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়।
নতুন গভর্নরের ব্যবসায়িক পটভূমি নিয়ে শুরুতে সমালোচনা থাকলেও অনেকেই এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাদের মতে, বাস্তব অর্থনীতির অভিজ্ঞতা থাকায় তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যের সমস্যাগুলো ভালোভাবে বুঝতে পারবেন।
তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিতে তার অভিজ্ঞতা কতটা যথেষ্ট।
নিয়োগ প্রক্রিয়া: চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কোথায়
সূত্র জানায়, ডেপুটি গভর্নর নিয়োগের প্রক্রিয়া সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে নয়। এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়।
সাধারণত একটি সার্চ কমিটি গঠন করা হয়, যারা যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করে। এরপর বিজ্ঞাপন, আবেদন যাচাই, সংক্ষিপ্ত তালিকা ও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়।
অর্থাৎ, গভর্নরের আগ্রহ থাকলেও চূড়ান্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতেই হবে।
বর্তমান ডেপুটি গভর্নরদের প্রেক্ষাপট
বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চারজন ডেপুটি গভর্নর দায়িত্ব পালন করছেন—
-
নুরুন নাহার
-
ড. মো. হাবিবুর রহমান
-
মো. জাকির হোসেন চৌধুরী
-
কবির আহাম্মদ
তবে তাদের মধ্যে কারও পারফরম্যান্স নিয়ে অসন্তোষ এবং কারও বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে তদন্তের বিষয় সামনে এসেছে, যা নতুন নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি মনে করেন, ডেপুটি গভর্নর নিয়োগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগ্যতা ও দৃষ্টিভঙ্গি।
তার মতে, বাণিজ্যিক ব্যাংকে সফল হলেই যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ভালো করা যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
তিনি বলেন,
“সঠিক জায়গায় সঠিক ব্যক্তিকে বসানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু কাউকে নিয়ে এসে বসিয়ে দিলে তার কাছ থেকে ভালো ফল আশা করাও অন্যায় হবে।”
সামনে বড় প্রশ্ন
বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্নগুলো হলো—
-
কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি বাইরে থেকে অভিজ্ঞ ব্যাংকার আনবে?
-
নাকি ভেতর থেকেই দক্ষ নেতৃত্ব তৈরি করবে?
-
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে কি সত্যিই সেরা ব্যক্তিকে নির্বাচন করা হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি নিয়োগ নয়—বরং দেশের আর্থিক খাতের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
পাঠকের মন্তব্য