![]()
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে। আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম বৃদ্ধি, জাহাজ ভাড়া ও প্রিমিয়াম চার্জের ঊর্ধ্বগতির ফলে আমদানিনির্ভর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কয়লার দামে ঊর্ধ্বগতি
বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ান কোল ইনডেক্স অনুযায়ী, টনপ্রতি কয়লার দাম প্রায় ৭৩ ডলারে পৌঁছেছে, যা মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত শুরুর আগে ছিল প্রায় ৬৭ ডলার। অর্থাৎ মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় ৯ শতাংশ দাম বেড়েছে।
বিশেষ করে ৫ হাজার কিলোক্যালরি মানের কয়লা, যা বাংলাদেশের আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ব্যবহৃত হয়, তার দামও একইভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসল প্রাইস ইনডেক্সেও বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। জানুয়ারিতে যেখানে টনপ্রতি দাম ছিল ১০৯ ডলার, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩২ ডলারে—যা দেড় মাসে প্রায় ২১ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
জাহাজ ভাড়া ও প্রিমিয়াম: মূল চাপের জায়গা
যদিও কয়লার মূল দামে তুলনামূলক কম বৃদ্ধি হয়েছে, তবে আমদানির প্রকৃত ব্যয় বাড়ার প্রধান কারণ হচ্ছে জাহাজ ভাড়া ও প্রিমিয়াম চার্জের বৃদ্ধি।
বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এক মাস আগে যেখানে টনপ্রতি ফ্রেইট খরচ ছিল প্রায় ১৫ ডলার, তা এখন বেড়ে ২১ ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ কিছু ক্ষেত্রে জাহাজ ভাড়া সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
এর সঙ্গে প্রিমিয়াম চার্জ যুক্ত হয়ে বর্তমানে দেশে কয়লা আনতে টনপ্রতি মোট ব্যয় ৯০ থেকে ৯৫ ডলারের কাছাকাছি দাঁড়াচ্ছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক শিপিং সংকটের কারণে পর্যাপ্ত জাহাজ না পাওয়াও একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে প্রভাব
বাংলাদেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ২৬ থেকে ২৭ শতাংশই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে এই সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ৭৬৯ মেগাওয়াট।
দেশে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ১২ হাজার ৫০০ থেকে ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের মধ্যে ওঠানামা করছে। এর মধ্যে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি। ভারতের আমদানিকৃত বিদ্যুৎসহ এ সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছায়।
এলএনজি ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ কমাতে বর্তমানে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে।
মজুদ পরিস্থিতি ও প্রস্তুতি
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে কয়লার মোট মজুদ রয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৬৫ হাজার টন।
বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে মজুদের চিত্র ভিন্ন হলেও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে—
-
পটুয়াখালী কেন্দ্র: ৬১ দিনের মজুদ
-
রামপাল কেন্দ্র: ৩৯ দিনের মজুদ
-
মাতারবাড়ী কেন্দ্র: ১০ দিনের মজুদ
-
বাঁশখালী কেন্দ্র: ৪২ দিনের মজুদ
তবে কিছু কেন্দ্রের মজুদ তুলনামূলক কম হওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়লে তার প্রভাব সব ধরনের জ্বালানিতে পড়ে।
বিশেষ করে এলএনজির দাম বাড়ার কারণে অনেক দেশ আবার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফিরে যাচ্ছে। এতে বৈশ্বিকভাবে কয়লার চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে এবং দামও বাড়ছে।
বাংলাদেশ যেহেতু আমদানিনির্ভর কয়লার ওপর নির্ভরশীল, তাই এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ে।
বৈশ্বিক প্রবণতা: কয়লার দিকে ঝুঁকছে বিশ্ব
এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যেই এলএনজির বিকল্প হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
-
পাকিস্তান স্থানীয় কয়লাভিত্তিক উৎপাদন বাড়াচ্ছে
-
ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম কয়লার ব্যবহার বাড়াচ্ছে
-
থাইল্যান্ড এলএনজি সাশ্রয়ে কয়লা ব্যবহার বাড়াচ্ছে
-
দক্ষিণ কোরিয়া উৎপাদন সীমা শিথিল করার পরিকল্পনায়
-
জাপানও কয়লাভিত্তিক উৎপাদন উচ্চমাত্রায় ধরে রাখছে
এই প্রবণতা বৈশ্বিক কয়লার বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বিদ্যুতের দামে প্রভাবের আশঙ্কা
বিপিডিবির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় কোনো সংকট না থাকলেও যদি কয়লার দাম ও আমদানি ব্যয় বাড়তেই থাকে, তাহলে তা বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়াবে।
বর্তমানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি খরচ গড়ে প্রায় সাড়ে ১১ টাকা। এই ব্যয় আরও বাড়লে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে।
সামনে কী চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—
-
কয়লার স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা
-
আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা
-
বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখা
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও স্থানীয় উৎসের উন্নয়ন ছাড়া এই চাপ থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে।
পাঠকের মন্তব্য