![]()
ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে দিনের পর দিন গুদামে ফেলে রাখা হয়েছে ভিডাব্লিউবি সুবিধাভোগীদের চাল—এক বস্তাও পৌঁছায়নি তাদের ঘরে। অথচ চালগুলো বরাদ্দ হয়েছিল চার মাস আগেই।
যে চাল পেলে দরিদ্র নারীদের ঘরে কয়েক সপ্তাহের খাবারের নিশ্চয়তা তৈরি হতো, সেই চাল আজও তালাবদ্ধ গুদামের বাঁশের স্তূপে জমে আছে। আর সুবিধাভোগীরা প্রতিদিন ইউনিয়ন পরিষদে এসে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন।
তাদের চোখে বারবার ফুটে উঠছে একই প্রত্যাশা—
“চাল কবে পাবেন?”
কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর নেই কারও কাছে।
ইউএনওর নির্দেশ অমান্য, অভিযোগ মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে
দীর্ঘ দিনেও চাল বিতরণ না হওয়ায় ক্ষোভ এখন তীব্র।
অভিযোগের তীর সোজা গিয়ে ঠেকেছে মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা আবু বেলাল ছিদ্দিক–এর দিকে। তাঁকে নিয়ে উঠেছে দুইটি ভয়াবহ অভিযোগ—
১) ইউএনওর নির্দেশ উপেক্ষা
ইউএনও মফিজুর রহমান বারবার নির্দেশ দিলেও তিনি চাল বিতরণের কোনো উদ্যোগ নেননি।
২) নাম পরিবর্তন করে তালিকায় কারসাজি
পূর্বের ইউএনও পলাশ কুমার দেবনাথের চূড়ান্ত করা তালিকা থেকে প্রায় ২৫০ জনের নাম বাদ দিয়ে নতুন তালিকা তৈরি করে পুরোনো তারিখে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।
এ ঘটনার কারণে চার মাসের চাল—
জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর—মোট ৯,৮৩২ বস্তা
গুদামে পড়ে আছে।
গরিবদের জন্য বরাদ্দ চাল এতদিন পড়ে থাকায় ক্ষোভ এখন বিস্ফোরণের কাছাকাছি।
অসহায় মানুষের কণ্ঠে হাহাকার—“১ কেজি চাল মানে আমাদের দিনের খাবার”
মফিজুল, মাজেদ, তরিকুলদের মতো সুবিধাভোগীরা বলেন—
“আমরা গরিব মানুষ। ১ কেজি চাল আমাদের কাছে অনেক কিছু। ৩০ কেজি চাল পেলে পরিবারের অর্ধমাসের খাবার চলে। কিন্তু চার মাস ধরে ঘুরছি, কেউ বলে দিতে পারে না চাল কবে পাব।”
চোখে উদ্বেগ, মুখে লজ্জা, আর হৃদয়ে দুঃখ—
গরিবের কষ্ট কেউ বুঝতে না–বুঝতেই চলছে ফাইলবন্দি কারসাজি।
ইউপি সচিব ও জনপ্রতিনিধিরাও অসহায়
ইউপি সচিব ও চেয়ারম্যানদের অভিযোগ—
“প্রতিদিন সুবিধাভোগীরা আসেন, আমরা কিছুই বলতে পারি না। মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার দপ্তর থেকে কোনো সঠিক নির্দেশনা নেই। ফলে মানুষকে বারবার ঘুরিয়ে দিতে হচ্ছে।”
ইউনিয়ন পরিষদের ওপর মানুষের চাপ বাড়ছে, আর তালিকার কারসাজির অভিযোগে প্রশাসনের ভেতরে অসন্তোষ তীব্র হচ্ছে।
খাদ্য গুদাম কর্মকর্তার অসহায়তা—“গরিবের চাল এভাবে পড়ে থাকা ঠিক নয়”
খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা শাখাওয়াৎ হোসেন বলেন—
“চার মাসে মোট ৯,৮৩২ বস্তা চাল এসেছে। মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তাকে অনেকবার বলেছি, কিন্তু কোনো উদ্যোগ নেই। এর মধ্যে নভেম্বরে নতুন চাল আসবে। গরিবের চাল ফেলে রাখা ঠিক হয়নি। আমরাও নিরুপায়।”
গুদামে বাড়তি মুজদে জায়গার সংকট, চাপ বাড়ছে কর্মীদের ওপর, আর দরিদ্র মানুষের অধিকার বন্দি হয়ে আছে ধুলো জমা বস্তাগুলোর ভেতর।
তালিকা কারসাজির অভিযোগ স্বীকার করলেন কর্মকর্তা, দায় অস্বীকার
অভিযোগ স্বীকার করেও আবু বেলাল ছিদ্দিক বলেন—
“নতুন তালিকায় স্বাক্ষর হয়ে গেলেই চাল বিতরণ শুরু হবে। আমার কিছু করার নেই।”
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—
চার মাস ধরে কিছুই করা গেল না কেন?
গরিবের চাল কেন আটকে রাখা হলো?
ইউএনওর কঠোর অবস্থান—“চাল গুদামে ফেলে রাখার সুযোগ নেই”
ইউএনও মফিজুর রহমান বলেন—
“আমি বারবার নির্দেশ দিয়েছি চাল বিতরণের। কিন্তু মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা তা করেননি। কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে তিনটি ইউনিয়ন ইতোমধ্যে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছে, কিন্তু তবুও বিতরণ শুরু হয়নি।
৮ বছর ধরে একই পদে থাকা কর্মকর্তা—তুলছেন আরও প্রশ্ন
২০১৭ সালের নভেম্বরে বালিয়াডাঙ্গীতে যোগদান করেন আবু বেলাল ছিদ্দিক।
৮ বছরে বদলি হয়েছেন ৭ জন ইউএনও, কিন্তু তিনি এখনো একই পদে।
তাছাড়া পাশের উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বও তাঁর কাছে—
যা আরও বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে।
স্থানীয়রা বলছেন—
“একই পদে এতদিন থাকলে তো অনিয়মে সাহস বাড়বেই।”
শেষ কথা—গরিবের অধিকার আটকে রাখার দায় কার?
৪ মাস ধরে ক্ষুধার্ত মানুষের চাল গুদামে পড়ে আছে, আর ভুক্তভোগীরা বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন হাহাকার নিয়ে।
যে চাল তাদের সন্তানদের জন্য খাবার হতো, পাচ্ছেন না সেই অধিকার।
ভিডাব্লিউবি–র উদ্দেশ্য ছিল দরিদ্র নারীদের সহায়তা—
কিন্তু এখানে সহায়তার সেই চালই হয়ে উঠেছে অনিয়মের শিকার।
মানবিকতা হারিয়ে গেলে উন্নয়নও অর্থহীন—
আর প্রশাসনের অনীহা যখন মানুষের মৌলিক অধিকার আটকে রাখে, তখন প্রশ্ন ওঠে—
দোষের দায় আসলে কার?
পাঠকের মন্তব্য