বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র এবার হারিয়েছে পাসপোর্ট শক্তির মর্যাদা। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স–এর প্রকাশিত হেনলি পাসপোর্ট সূচক ২০২৫–এর সর্বশেষ হালনাগাদে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো শীর্ষ ১০ থেকে ছিটকে পড়েছে।
গত ৭ অক্টোবর প্রকাশিত সূচকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখন ১২তম, যা তারা ভাগ করছে মালয়েশিয়ার সঙ্গে। ২০১৪ সালে এই সূচকে শীর্ষে থাকা দেশটির ক্রমাগত পতন বিশ্বজুড়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্টের পতনের কারণ
হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স জানিয়েছে, গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্ট শক্তির ক্রমাগত অবনমন ঘটেছে।
২০১৪ সালে দেশটি ছিল প্রথম, ২০১৫ সালে দ্বিতীয়, ২০২৪ সালে সপ্তম— আর ২০২৫ সালে নেমে এসেছে দ্বাদশ স্থানে।
বর্তমানে একজন মার্কিন নাগরিক ২২৭টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যের মধ্যে ১৮০টিতে ভিসা ছাড়াই প্রবেশ করতে পারেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক কূটনৈতিক পরিবর্তন ও পারস্পরিক ভিসা নীতির পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার কমে গেছে।
-
গত এপ্রিল মাসে ব্রাজিল মার্কিন নাগরিকদের জন্য ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার বাতিল করে।
-
চীন এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভিসামুক্ত তালিকায় রাখেনি।
-
পাপুয়া নিউগিনি ও মিয়ানমার সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে।
-
সর্বশেষ সোমালিয়া ও ভিয়েতনাম নতুন ই–ভিসা পদ্ধতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়েছে।
এসব সিদ্ধান্তের সম্মিলিত প্রভাবে হেনলি সূচকে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ দশ থেকে ছিটকে পড়ে।
যুক্তরাজ্যের অবস্থাও ভালো নয়
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যের পাসপোর্টও এক সময় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী হিসেবে বিবেচিত হলেও, বর্তমানে তা অষ্টম স্থানে নেমে এসেছে।
২০১৫ সালে দেশটির পাসপোর্ট ছিল প্রথম স্থানে, কিন্তু ব্রেক্সিট–পরবর্তী জটিল ভ্রমণ নীতি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কড়াকড়ির কারণে যুক্তরাজ্যের পাসপোর্ট শক্তিও ক্রমশ কমছে।
এশিয়ার তিন দেশ শীর্ষে
এবারের সূচকে এশিয়ার তিন দেশ আবারও শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।
১️ সিঙ্গাপুর – ১৯৩ দেশে ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার
২️ দক্ষিণ কোরিয়া – ১৯০ দেশ
৩️ জাপান – ১৮৯ দেশ
এই ধারাবাহিকতাই প্রমাণ করে যে, এশিয়ার দেশগুলো এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ভ্রমণ স্বাধীনতার নতুন মানদণ্ড স্থাপন করছে।
বাংলাদেশের অবস্থান: ১০০তম
বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবস্থান এবারও খুব একটা উন্নতি পায়নি।
১০০তম স্থানে থাকা বাংলাদেশের নাগরিকেরা বিশ্বের মাত্র ৩৮টি দেশে ভিসা ছাড়াই প্রবেশ করতে পারেন।
এই তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি আছে উত্তর কোরিয়া।
তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, তালিকাভুক্ত অনেক দেশেই বাংলাদেশি ভ্রমণকারীরা নানা জটিলতা ও হয়রানির মুখে পড়েন।
অনেকে অভিযোগ করেন, “ভিসামুক্ত” সুবিধা থাকলেও অনেক দেশে তাদের অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদ, প্রবেশ বিলম্ব বা এমনকি প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয়।
সূচক তৈরির পদ্ধতি
হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স জানায়, আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (IATA)–এর তথ্যের ভিত্তিতে এই সূচক তৈরি করা হয়।
বিশ্বের ১৯৯টি দেশের পাসপোর্ট ও ২২৭টি গন্তব্যে প্রবেশাধিকারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়— কোন দেশের নাগরিকরা কতটি দেশে আগাম ভিসা ছাড়াই যেতে পারেন।
এভাবেই নির্ধারিত হয় পাসপোর্টের শক্তি বা গ্লোবাল মুভমেন্ট ফ্রিডম ইনডেক্স।
বৈশ্বিক বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাসপোর্ট শক্তির অবনমন শুধু ভ্রমণ স্বাধীনতার বিষয় নয়— এটি একটি দেশের কূটনৈতিক প্রভাব, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক মর্যাদার প্রতিফলন।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই অবনমন ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিশ্ব রাজনীতিতে তাদের একক আধিপত্য কমে আসছে।
অন্যদিকে এশিয়ার দেশগুলোর অগ্রগতি দেখাচ্ছে, বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য এখন ধীরে ধীরে পূর্বমুখী হচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভিসা–নীতি সহজীকরণ, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং পর্যটন কূটনীতি জোরদার করলে আগামী কয়েক বছরে অবস্থান উন্নত করা সম্ভব।
পাঠকের মন্তব্য