![]()
ইবি রিপোর্ট
আগামী তিন বছরে বাংলাদেশকে একসঙ্গে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার করা। এসব লক্ষ্য অর্জনে সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানীর সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) কার্যালয়ে আয়োজিত এক মিডিয়া সংলাপে তিনি এ কথা বলেন। ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ: জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ও আমাদের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে আগামী দিনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও করণীয় নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন তিনি।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং সুদের হার কমানোর উদ্যোগ একসঙ্গে নিতে হবে। পাশাপাশি রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে সংস্কার এবং সরকারি ব্যয়ের মান নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সময়ে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে হবে।
তার মতে, এই তিনটি লক্ষ্য আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। সমন্বিতভাবে এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আগামী তিন বছর রাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এ সময় শেষে দেশ পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাবে। তাই অর্থনৈতিক লক্ষ্যগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বচ্ছতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সরকারের বড় দায়িত্ব।
সংস্কার কর্মসূচি সংসদে আলোচনার প্রস্তাব
এলডিসি উত্তরণকে শুধু আমলাতান্ত্রিক কিংবা অর্থনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে না দেখার আহ্বান জানান দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, উত্তরণকালীন সংস্কার পরিকল্পনা সংসদে উপস্থাপন করে আলোচনা করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য তৈরির সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি মন্ত্রিসভার নিয়মিত আলোচ্যসূচিতে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর দায়িত্ব ও জবাবদিহিও নির্ধারণ করতে হবে।
তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি শুধু অর্থ বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। জ্বালানি, প্রযুক্তি, নৌপরিবহনসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই পুরো প্রক্রিয়াকে সরকারের সামগ্রিক দায়িত্ব হিসেবে নিতে হবে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি।
এ ছাড়া কারিগরি পর্যায়ে ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্মকর্তাদের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করার ওপর জোর দেন এই অর্থনীতিবিদ।
অগ্রগতি জানাতে ড্যাশবোর্ড তৈরির প্রস্তাব
জাতিসংঘের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে একটি ড্যাশবোর্ড তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন দেবপ্রিয়। তার মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পাশাপাশি দেশের জনগণকেও সেগুলোর অগ্রগতি জানাতে হবে। কোন প্রতিশ্রুতি কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, দায়িত্বে কোন মন্ত্রণালয় বা সংস্থা রয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কী অগ্রগতি হয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন।
তিনি জানান, ২০১৮ সালে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি)। তখন উত্তরণের পর বিদ্যমান আর্থিক ও বাজারসুবিধা ধরে রাখাই ছিল প্রধান বিবেচনা। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি শুধু সুযোগ-সুবিধা সংরক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে পুরো অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন জড়িত।
এ কারণে ইআরডির বর্তমান সক্ষমতা দিয়ে এত বিস্তৃত কর্মসূচি পরিচালনা কঠিন বলে মনে করেন তিনি। উত্তরণ প্রস্তুতি ও সংস্কার কার্যক্রমের দায়িত্ব আরও উচ্চপর্যায়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন দেবপ্রিয়। শুধু অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকলে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও বাস্তবায়নের গতি নিশ্চিত করা কঠিন হবে বলেও জানান তিনি।
সর্বদলীয় সংসদীয় ককাস গঠনের উদ্যোগ
এলডিসি উত্তরণ ও সংস্কার কার্যক্রম মূল্যায়নে সিপিডি ২৩টি বিষয় চিহ্নিত করেছে বলে জানান দেবপ্রিয়। এসব বিষয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি সংসদ সদস্যদের অংশগ্রহণে একটি সর্বদলীয় কমিটি বা ককাস গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, বিভিন্ন দলের ১০ জন সংসদ সদস্যকে নিয়ে ককাস গঠনের বিষয়ে স্পিকারের দপ্তর থেকে নোটিশ জারি হয়েছে। শিগগিরই এটি আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করবে। এর মাধ্যমে উত্তরণ ও সংশ্লিষ্ট সংস্কার নিয়ে সংসদ সদস্যদের মধ্যে আলোচনা এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা করা হবে।
ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তের সঙ্গে চাই অর্জন
সংলাপের সমাপনী বক্তব্যে দেবপ্রিয় বলেন, এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানোর জাতিসংঘের সিদ্ধান্তকে তারা ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তবে এটি একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। তাই বাড়তি সময়ের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও বাংলাদেশকে উল্লেখযোগ্য অর্জন দেখাতে হবে।
তিনি বলেন, এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ যেসব বাণিজ্যিক ও আর্থিক সুবিধা পেয়ে এসেছে, সেগুলো থেকে ধাপে ধাপে বেরিয়ে আসার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। আগামী বাজেটে কোন খাতে সুবিধা কমবে এবং কোথায় নতুন সহায়তা বাড়বে, তা পরিষ্কার করতে হবে।
সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় না থাকলে ভবিষ্যতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি। এ জন্য সরকার, সংসদ, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
দেবপ্রিয়র ভাষ্য, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে যতটা দক্ষতা দেখা গেছে, বাস্তবায়নে ততটা দেখা যায়নি। এবার সেই ধারার পুনরাবৃত্তি না করে আগামী তিন বছরে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা দেখাতে হবে। তার মতে, এ কাজের জন্য শুধু কারিগরি ও প্রশাসনিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্রিয় ও দৃশ্যমান অঙ্গীকার।