![]()
ইবি রিপোর্ট
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে চীনের সঙ্গে মূল্য প্রতিযোগিতায় চাপে পড়েছেন বাংলাদেশের জুতা রপ্তানিকারকেরা। এর প্রভাবে ইউরোপের ক্রেতাদের কাছ থেকে কিছুটা কমেছে ক্রয়াদেশ। তবে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন অর্ডার পাওয়া, ভারতের বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধি এবং মেক্সিকোয় নতুন বাজার সম্প্রসারণের ফলে সামগ্রিকভাবে জুতা রপ্তানি বাড়ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে তৈরি পোশাকের তুলনায় অনেক বেশি।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশ থেকে ৪২ কোটি মার্কিন ডলারের জুতা রপ্তানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩১ কোটি ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে জুতা রপ্তানি বেড়েছে ৩৩ শতাংশ। অন্যদিকে, একই সময়ে দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পাল্টা শুল্ক আরোপ করার পর চীনা পণ্য দেশটির বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশি শুল্কের মুখে পড়ে। এতে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় চীনের রপ্তানিকারকেরা তৈরি পোশাক ও জুতার মতো পণ্যের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বেশি মনোযোগী হন। ইউরোপের ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে তাঁরা দাম কমিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু করেন।
চীনের কম দামের সঙ্গে তাল মেলানো বাংলাদেশের জুতা রপ্তানিকারকদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। কারণ, দেশে তৈরি চামড়াবিহীন জুতার কাঁচামালের বড় অংশ চীন থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে চীনা রপ্তানিকারকদের সঙ্গে দামের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। এর প্রভাবে ইইউর ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে জুতা কেনা কমিয়েছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্কের প্রভাব বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। দেশটি থেকে বাংলাদেশি জুতার ক্রয়াদেশ বাড়ছে। একই সঙ্গে ভারতের বাজারেও রপ্তানি সম্প্রসারিত হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে প্রথমবারের মতো মেক্সিকোয় জুতা পাঠানো শুরু করেছে বাংলাদেশের একটি কারখানা। এসব কারণে ইউরোপে চাপ থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিক রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে চামড়া ও চামড়াবিহীন—দুই ধরনের জুতা রপ্তানি হয়। তবে রপ্তানিতে এখনো চামড়ার জুতার অংশ বেশি। গত অর্থবছরে মোট ১২২ কোটি ডলারের জুতা রপ্তানি হয়েছে। এর মধ্যে চামড়ার জুতার অংশ ছিল ৫৭ শতাংশ, আর চামড়াবিহীন জুতার অংশ ৪৩ শতাংশ। বিশ্ববাজারের চিত্র অবশ্য এর বিপরীত।
পর্তুগিজ ফুটওয়্যার, কম্পোন্যান্ট অ্যান্ড লেদার গুডস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এপিআইসিসিএপিএস) উদ্যোগে গঠিত সংবাদমাধ্যম ওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যারের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে অর্থমূল্যের হিসাবে রপ্তানি হওয়া জুতার ৬৩ শতাংশ চামড়াবিহীন এবং ৩৭ শতাংশ চামড়ার।
ইপিবির তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ১৩০ কোটি ডলারের জুতা রপ্তানি হয়েছিল। পরের অর্থবছরে তা কমে ১১৯ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। তবে সর্বশেষ বিদায়ী অর্থবছরে এ খাতে আড়াই শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের মোট জুতা রপ্তানির ৪০ শতাংশ ছিল চামড়াবিহীন জুতা। পরের বছর এ হার বেড়ে ৪৪ শতাংশ হয়।
চামড়াবিহীন জুতা রপ্তানিকারক এনপলি ফুটওয়্যার গত অর্থবছরে ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা দেশীয় মুদ্রায় ৪৬৭ কোটি টাকা। আগের বছরের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশের চামড়াবিহীন জুতা রপ্তানিতে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ছিল ১ দশমিক ৬২ শতাংশ।
প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, কারখানাটিতে বর্তমানে ৩ হাজার কর্মী কাজ করছেন। প্রতিদিন সেখানে ১৪ হাজার জোড়া জুতা তৈরি হয়। ক্রয়াদেশ বাড়তে থাকায় আগামী মাস থেকে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে আরেকটি পালা বা শিফট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য নতুন করে দেড় হাজার কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। এতে রপ্তানির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তাঁরা।
এনপলি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রিয়াদ মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিনটি মার্কিন ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান আমাদের কারখানায় পণ্য উৎপাদন করাতে আগ্রহী। তবে তাদের কিছু শর্ত রয়েছে। সেসব শর্তে পরিপালনে আমরা কারখানার উন্নয়নে নতুন করে বিনিয়োগ করব। কারখানার উন্নয়ন হয়ে গেলে দুই বা তিন শিফটে উৎপাদন হবে।’
দেশীয় জুতা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ফাইভ-আর ফুটওয়্যার চলতি অর্থবছরে মেক্সিকোয় জুতা রপ্তানি শুরু করেছে। এর আগে বাংলাদেশ থেকে দেশটিতে জুতা রপ্তানির নজির ছিল না।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাসির খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘চীনাদের কারণে ইইউর বাজারে আমাদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। ফলে আমাদের উদ্যোক্তারা এখন যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার বাজারের দিকে বেশি নজর দিচ্ছেন। এ ছাড়া জুতার বৈশ্বিক চাহিদাও পরিবর্তিত হচ্ছে। চাহিদা বাড়তে থাকায় আগামী বছরগুলোতে চামড়াবিহীন জুতা রপ্তানিতে ৫০-৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। এ জন্য বন্ড সুবিধাসহ অন্যান্য জটিলতা দূর করতে হবে।’
পাঠকের মন্তব্য