![]()
ইবি রিপোর্ট
দেশজুড়ে যানবাহনের নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স প্রদান ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) জেলা পর্যায়ের দপ্তরগুলো চলছে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে। অধিকাংশ জেলায় নেই নিজস্ব কার্যালয়, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কিংবা পর্যাপ্ত জনবল। কোথাও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এক বা একাধিক কক্ষ ব্যবহার করে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এই অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও কর্মী সংকটের কারণে চালকদের বাধ্যতামূলক ড্রাইভিং পরীক্ষার মান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, জেলা পর্যায়ের এসব দপ্তর থেকে গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যানবাহনের চালকদের যে লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর জন্য নেওয়া ড্রাইভিং টেস্ট শতভাগ ত্রুটিমুক্ত ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরীক্ষায় যথাযথভাবে দক্ষতা যাচাই না করে লাইসেন্স দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট চালকদের সড়কে চলাচল নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ছাড়াই দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিআরটিএর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। মেহেরপুর, রংপুর, সুনামগঞ্জ, জয়পুরহাট, পিরোজপুর, মাগুরা, বগুড়া, সিলেট, চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ বিভিন্ন সার্কেল এবং বিভাগীয় কার্যালয়ে নিজস্ব ভবন, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও পর্যাপ্ত কর্মীর অভাব রয়েছে।
মেহেরপুর বিআরটিএর ইন্সপেক্টর সাইদুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, নিজস্ব ভবন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র না থাকায় তাদের কাজ পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে। রংপুর বিআরটিএর সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিন) শফিকুল আলম সরকার বলেন, সেখানে বিশেষ করে জরুরি কাগজপত্র সংরক্ষণে সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে।
খুলনা সার্কেল কার্যালয়ে অনুমোদিত ১২টি পদের মধ্যে তিনটি শূন্য রয়েছে। একই বিভাগের বিভাগীয় কার্যালয়ে অনুমোদিত ১০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র চারজন। অর্থাৎ সেখানে ছয়টি পদই শূন্য। অন্যদিকে, চট্টগ্রামে বিআরটিএর বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক (ইঞ্জি.) শফিকুজ্জামান ভূঞা জানান, জনবল কম থাকায় কাজের চাপ সামলানো বেশ কষ্টকর ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।
বিআরটিএর পিরোজপুর সার্কেলের সহকারী পরিচালক মতিউর রহমান ফাহাদও জনবল সংকট এবং নিজস্ব ভবন না থাকাকে কার্যক্রম পরিচালনার প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান বিআরটিএর নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। তবে এরপরও প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক অবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। নিয়মিত কাজের বাইরে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে চেয়ারম্যান কোনো মন্তব্য করেননি।
বিআরটিএর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৮ হাজার কোটি থেকে ১৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করেছে। এত রাজস্ব আয় সত্ত্বেও অবকাঠামো ও জনবল সংকটের সমাধান না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বর্তমান মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সরকারের বিআরটিএ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। এ প্রতিষ্ঠান থেকে সরকার ভালো অংকের রাজস্ব পায়, তার পরও এমন উদাসীনতা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অস্থায়ী আমলাদের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া এই প্রতিষ্ঠানের সমস্যার অন্যতম কারণ। এসব অস্থায়ী কর্মকর্তারা টেকসই কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হন না। সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের মধ্যে এই প্রতিষ্ঠানকেও অন্তর্ভুক্ত রাখতে হবে।’
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবীবুর রশিদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘অনেক জেলায় বিআরটিএর স্থায়ী কার্যালয় ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নেই, লোকবল সংকট রয়েছেÑ বিষয়টি সত্য। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো সাধারণত বিআরটিসির মাধ্যমে ব্যব্হার করা হয়। ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বিআরটিএর জন্য ৭টি জেলায় নিজস্ব ভবন তৈরির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, এর ‘ফিজিবিলিটি টেস্ট’ করার কাজ চলছে। দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া এসব সীমাবদ্ধতার জায়গা থেকে আমরা বের হতে চাইছি।’
জনবল সংকট প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিটা মন্ত্রণালয়ে এ লোকবল সংকট রয়েছে। মাস্টার রোল ও আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দিয়ে এ সংকট দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
বিআরটিএর অবকাঠামো ও জনবল ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে সরকারের উদ্যোগের কথা জানানো হলেও মাঠপর্যায়ে এসব সীমাবদ্ধতা দূর করতে কতটা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা এখন দেখার বিষয়।
পাঠকের মন্তব্য