![]()
ইবি রিপোর্ট
দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের কাছে বড় অঙ্কের অর্থায়ন চেয়েছে বাংলাদেশ সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২.৭৭ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প অর্থায়নের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা চাওয়া হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, প্রকল্প অর্থায়নের পরিমাণ প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা এবং বাজেট সহায়তা প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, প্রস্তাবিত অর্থ দিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বড় পরিবহন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত প্রকল্প বরাদ্দের বাইরে আগামী তিন বছরে আরও ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। ‘রেজিলিয়েন্স, রিফর্ম অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ’ (আরআরআইপি) নামের প্রস্তাবিত কাঠামোর আওতায় এই অর্থায়ন চাওয়া হয়েছে।
গত ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে প্রথমবারের মতো ১০ বিলিয়ন ডলারের আরআরআইপি কাঠামোর প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ। পরে ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে সম্ভাব্য চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সম্মেলন শেষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত অংশীদারিত্ব চূড়ান্ত করতে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), বিশ্বব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি কারিগরি দল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী বছরের জুনের মধ্যে চুক্তিটি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
ব্যাংককের সম্মেলনে ১২ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আলোচনার অগ্রগতি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, “এই ঋণের বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং আগামীতেও আলোচনা হবে।”
বৈদেশিক ঋণের ওপর বাড়তি নির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশের জরুরি অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণের মতো পর্যাপ্ত রাজস্ব বা আর্থিক সক্ষমতা সরকারের হাতে নেই। তবে জাতীয় ঋণের বোঝা যাতে অতিরিক্ত না বাড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। তার ভাষায়, “বিদ্যমান ঋণের ওপর নতুন করে বাড়তি চাপ এড়াতে স্পষ্ট ও পরিমাপযোগ্য ফলাফলের ভিত্তিতে এবং অত্যন্ত স্বচ্ছ ও দক্ষতার সাথে এই অর্থ ব্যয় করতে হবে।”
বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অপারেশনস) অ্যানা বিয়ার্ড এবং দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোয়েল বার্লির সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে। এসব আলোচনায় চলতি অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২.৭৭ বিলিয়ন ডলারের ১০টি পাইপলাইনভুক্ত প্রকল্প নিয়ে অগ্রগতি হয়েছে বলে আনুষ্ঠানিক সূত্র জানিয়েছে।
তুলনামূলক কম খরচে দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানির জন্য বিশ্বব্যাংকের সহযোগী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) গ্যারান্টি হিসেবে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা চেয়েছে সরকার। এ ছাড়া আর্থিক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রোগ্রাম-২’-এর আওতায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি সহায়তা প্রকল্পের জন্য আরও ৩০০ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছে।
সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে তিনটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প— ঢাকা-চট্টগ্রাম কর্ডলাইন রেলপথ, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে এবং ঢাকা ইনার সার্কুলার রিং রোড। এ ছাড়া ঢাকার চারপাশের নদী ও খাল পুনরুদ্ধার এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে আমব্রেলা ইনভেস্টমেন্ট প্রজেক্টে (ইউআইপি) অর্থায়নের বিষয়েও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে।
আরআরআইপি কাঠামোর অধীনে চাওয়া অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার চারটি খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে সরকার। জ্বালানি তেল, সারসহ জরুরি পণ্য আমদানিতে ব্যয় করার প্রস্তাব রয়েছে ৪ বিলিয়ন ডলার। উদ্যোক্তাদের বাণিজ্য সুবিধা ও কর্মসংস্থান ধরে রাখতে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে (এমএসএমই) সহায়তা দিতে বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে ১.৫ বিলিয়ন ডলার।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও আর্থিক খাত পুনরুদ্ধারে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে ৩ বিলিয়ন ডলার। বাকি ১.৫ বিলিয়ন ডলার আপৎকালীন সহায়তা ও যৌথ অর্থায়নের জন্য রাখা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পরবর্তী ‘কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক’ (সিপিএফ)-এ আরআরআইপি কাঠামো অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। তবে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, এই অর্থায়নের উৎস ও শর্ত সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের তিন বছর মেয়াদি আইডিএ কর্মসূচির অধীনে বাংলাদেশ আগে কখনো বছরে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বরাদ্দ পায়নি। ফলে আরআরআইপির অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার বিশ্বব্যাংকের অন্যান্য অনিয়মিত অর্থায়ন চ্যানেল থেকে আসতে পারে। তার মতে, ঋণের প্রধান উৎস, সুনির্দিষ্ট অর্থের পরিমাণ এবং সম্ভাব্য শর্ত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার সময় এখনও আসেনি। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল করিডোর ও এক্সপ্রেসওয়ের অর্থায়নও প্রকল্পের নকশা এবং সরকারের বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।
ব্যাংককে অবস্থানকালে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্মকর্তাদের সঙ্গে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ প্যাকেজ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতের মূলধন ঘাটতি দূর করার বিষয়ে আইএমএফ বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এ জন্য দ্রুত কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদও দিয়েছে সংস্থাটি।
অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, আইএমএফের ঋণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর শর্ত বা ‘পারফরম্যান্স ক্রাইটেরিয়া’ বহাল থাকবে। তিনি বলেন, “আলোচনা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে কিছু সমস্যা সমাধান করা হবে।” পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে আইএমএফের একটি কারিগরি দল ঢাকায় আসবে বলেও জানান তিনি।
আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সম্মেলনের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বেসরকারি খাতবিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। সেখানে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংস্কার, পুনর্মূলধনীকরণ, বাণিজ্য অর্থায়ন এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন বৈশ্বিক ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে ব্যাংকিং সংস্কার, বিনিময় হারের নমনীয়তা এবং মুদ্রানীতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গ্যালির নেতৃত্বে আরেকটি প্রতিনিধিদল ইউরোক্লিয়ার, সিটি ব্যাংক, ফিচ রেটিংস, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক, এইচএসবিসি, টিসিএক্স, ক্লিয়ারস্ট্রিম ব্যাংকিং, ব্যাংক অব আমেরিকা, জেপি মরগান এবং গুগলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেয়।
এসব আলোচনায় বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং, সভরেন বন্ড ইস্যু, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়ে করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য