![]()
ইবি রিপোর্ট
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটায় অনেক কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ঢাকার উত্তরে আশুলিয়ায় হা-মীম গ্রুপের একটি পোশাক কারখানায় উৎপাদন চলার সময় গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যায় চারটি ডিজেল জেনারেটর। কারখানাটিতে ডেনিম কাপড় কাটা, সেলাই, ধোয়া, ইস্তিরি এবং পোশাকে বোতাম ও চেইন লাগানোর কাজ চলে। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে ৯৩ লাখ পোশাক তৈরি করে। তাদের বড় গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে গ্যাপ, আমেরিকান ইগল ও জেসি পেনি।
হা-মীম গ্রুপের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন বিভাগের প্রধান তনুল চক্রবর্তী বলেন, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটে। গ্যাসের পর ডিজেলই বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি হয়ে উঠেছে। তাঁর ভাষ্য, দেশের অর্থনীতির বড় অংশই যেন ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৫১০ বিলিয়ন ডলার। তবে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাবে দেশটি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে পড়েছে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৫০ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর খোলাবাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম প্রায় তিন গুণ হয়েছে।
পোশাকশিল্পে সংকটের প্রভাব
বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় উৎস তৈরি পোশাকশিল্প। এ খাতে সরাসরি কর্মরত প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। গত বছর পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি। শুধু হা-মীম গ্রুপ থেকেই রপ্তানি হয়েছে ১০০ কোটি ডলারের পোশাক।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও। জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের ঘাটতি তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ায় সরকার লোডশেডিং বাড়িয়েছে। হাসপাতাল ও ফার্মেসির মতো জরুরি সেবাপ্রতিষ্ঠান এর বাইরে রাখা হয়েছে। বাণিজ্যিক এলাকার আলোকসজ্জা বন্ধ করা হচ্ছে এবং দোকানপাটও আগের তুলনায় এক ঘণ্টা আগে বন্ধ হচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও কঠিন। কিছু এলাকায় বাসিন্দাদের দিনে সর্বোচ্চ ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হয়েছে। রান্নার গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক পরিবারকে ভোরে উঠে রান্নার প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়েছে।
জ্বালানি সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের নিজস্ব নীতিগত সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো ও দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় বাংলাদেশের মোট জ্বালানির প্রায় অর্ধেক মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করতে হয়।
জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে এলএনজি আমদানি ৮৩ শতাংশ কমে যায়। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সরবরাহে বিঘ্ন এবং দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি পুনঃগ্যাসীকরণ টার্মিনালের একটিতে অগ্নিকাণ্ডের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়। আগুনের কারণে টার্মিনালটি সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়ে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, জ্বালানি সংকট নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং বিরোধীদের একত্র করার মতো ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনে জ্বালানি নিরাপত্তা
বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গেও যুক্ত। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়েছে। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশ তার মোট বিদ্যুতের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ ভারত থেকে আমদানি করে। এ নির্ভরতা কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার হতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে।
এদিকে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটমের নির্মাণ করা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও বিলম্ব হয়েছে। প্রকল্পটিতে বাংলাদেশ ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যার বড় অংশ রাশিয়ার ঋণ থেকে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ব্যাংকের সঙ্গে অর্থ লেনদেন এবং পণ্য পরিবহনে জটিলতা তৈরি হওয়ায় প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হয়।
গত ১১ অক্টোবর কেন্দ্রটিতে প্রথম নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ডিসেম্বরে কেন্দ্রটি চালুর প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে ঘোষিত ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতায় পৌঁছানোর আগে কয়েক মাস ধরে ধাপে ধাপে পরীক্ষা চালাতে হবে।
রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে সহায়তা করা প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিধান রাখা যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট’ নিয়েও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ১৮ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া এ আইনের কারণে রূপপুরের ঋণ পরিশোধ ও পারমাণবিক জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বিশেষ ছাড় বা অনুমোদিত অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা নিতে হতে পারে।
বিকল্প উৎসের সন্ধানে বাংলাদেশ
জ্বালানি সরবরাহে বিকল্প উৎস খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানিপণ্যসহ বিপুল পরিমাণ মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করছে ঢাকা। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের সময় বেইজিংয়ের সঙ্গে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা দলিল সই হয়। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতাসংক্রান্ত চুক্তিও রয়েছে।
তবে চুক্তিগুলোর দুটি এমন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। ঢাকার সঙ্গে বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠতা বাড়ায় ওয়াশিংটনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য জ্বালানির সরবরাহ ও দাম এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক সংঘাত, আমদানিনির্ভরতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং কূটনৈতিক জটিলতা একসঙ্গে দেশের উৎপাদন ব্যয় ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর চাপ তৈরি করছে।