
ইবি রিপোর্ট
কয়লা সংকটের কারণে ভারতের আদানি পাওয়ারের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে ৫০০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াটের মধ্যে নেমে এসেছে। এর মধ্যে কেন্দ্রটির ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ইউনিট-১ গত ৩০ সেপ্টেম্বর ট্রিপ করায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউনিট-১ আবার চালু করতে চার দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে আদানি বিপিডিবিকে জানিয়েছে।
বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, কয়লা সংকটের কারণে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমেছে। এর মধ্যেই ইউনিট-১ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ আরও কমে গেছে।
তিনি জানান, ৩০ সেপ্টেম্বর বন্ধ হওয়া ইউনিট-১ পুনরায় চালু করতে চার দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে আদানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুর ১টায় গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে ৫০৯ মেগাওয়াটে নেমে আসে। এরপর থেকে সরবরাহ ৫০০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াটের মধ্যে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকাল ৬টায় কেন্দ্রটি থেকে বাংলাদেশে ৫০৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছিল।
এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর পিক আওয়ারে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ৮৩৪ দশমিক ১৪ মেগাওয়াট। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিবি) এর ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে কয়লা সংকটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
২৮ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রটির সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ৮২২ দশমিক ৫৮ মেগাওয়াট। ওই দিন কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা ছিল ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট।
কয়লা সংকট দেখা দেওয়ার আগে আদানির গোড্ডা কেন্দ্র থেকে পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ছিল।
২৭ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রটি থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৩২৩ দশমিক ০৬ মেগাওয়াট। এর আগের দিন, ২৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৩০৮ দশমিক ৮৭ মেগাওয়াট।
অর্থাৎ মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে কেন্দ্রটি থেকে বাংলাদেশের গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। একই সময়ে দেশের বেশ কয়েকটি গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও উৎপাদন কমেছে।
চাহিদা অনুযায়ী আদানি এবং আরও কয়েকটি বড় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর—পরপর দুই দিন দেশে লোডশেডিং ২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়।
ফলে আদানির গোড্ডা কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় অবস্থিত আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট রয়েছে। কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট।
এর মধ্যে অ্যাভেইলেবিলিটি ফ্যাক্টর অনুযায়ী বাংলাদেশে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করার কথা রয়েছে।
তবে কয়লার সংকটের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রটির উৎপাদন ও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে একাধিকবার বিঘ্ন ঘটেছে।
গত কয়েক মাস ধরেই গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিভিন্ন ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। কয়লার প্রাপ্যতা ও পরিবহনসংক্রান্ত সমস্যাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগেও কয়লা পরিবহনে সমস্যার কারণে দিনের বেলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়েছিল আদানি। কোম্পানিটি বাংলাদেশকে জানিয়েছিল, রেলপথে যানজট এবং কয়লা লোডিংয়ে বিধিনিষেধের কারণে গোড্ডা কেন্দ্রে কয়লাবাহী ট্রেন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
এর ফলে অফ-পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ উৎপাদন সীমিত রাখতে হচ্ছে বলে জানিয়েছিল কোম্পানিটি।
সর্বশেষ সংকটের মধ্যে ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ইউনিট-১ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। আগামী চার দিন ইউনিটটি বন্ধ থাকার কথা জানিয়েছে আদানি।
ফলে এ সময়ে কয়লার সরবরাহ বাড়ানো না গেলে কিংবা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ইউনিটটি পুনরায় চালু করা সম্ভব না হলে গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকতে পারে।
গ্রীষ্মকালে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে আদানির গোড্ডা কেন্দ্র থেকে সরবরাহ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে বিঘ্নের কারণ হিসেবে আবহাওয়া, রেলপথে যানজট, কয়লার প্রাপ্যতা এবং পরিবহনসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার কথা জানিয়েছে ভারতীয় কোম্পানিটি।
বর্তমানে ৮০০ মেগাওয়াটের ইউনিট-১ বন্ধ থাকায় কেন্দ্রটির উৎপাদন আরও কমেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ইউনিটটি চালু এবং কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হয় কি না, তার ওপর আগামী কয়েক দিনে আদানি কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের মাত্রা অনেকটাই নির্ভর করবে।
পাঠকের মন্তব্য