
ইবি রিপোর্ট
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে নীতিগত সুদের হার কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এর পরও বেসরকারি খাতে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে না। বিনিয়োগকারীদের আস্থা, জ্বালানি সরবরাহ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ব্যাংক খাতের নানা সমস্যায় নতুন বিনিয়োগ আটকে আছে।
চলতি বছরের জুনে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪.৪৭ শতাংশে। গত ৩৩ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। জুলাইয়ে এই হার সামান্য বেড়ে ৪.৬২ শতাংশ হলেও ডিসেম্বরের জন্য নির্ধারিত ৬.৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় তা এখনো অনেক কম।
উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু ঋণের খরচ কমালেই ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হন না। বিনিয়োগের পরিবেশ এবং ভবিষ্যতে লাভের সম্ভাবনাও তাদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে। বর্তমানে এসব ক্ষেত্রে নানা অনিশ্চয়তা থাকায় নতুন ঋণ নিয়ে কারখানা স্থাপন বা ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহ কম।
শিল্প খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ। উদ্যোক্তাদের মতে, কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদনক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। এতে বিদ্যমান উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়াই অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
এ অবস্থায় নতুন কারখানা স্থাপন কিংবা বিদ্যমান কারখানার সক্ষমতা বাড়ানোর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না অনেক উদ্যোক্তা। পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্পষ্টতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং উচ্চ খেলাপি ঋণও বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলছে।
ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। খেলাপি ঋণের চাপ ও ব্যাংক খাতের দুর্বলতার কারণে ঋণ বিতরণে ঝুঁকি বিবেচনা করছে তারা। ফলে সুদের হার কমলেও উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ পাওয়ার পরিস্থিতি আগের মতো সহজ হচ্ছে না।
অন্যদিকে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতিও বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির হার প্রায় ৮.২৬ শতাংশ। এর কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদাও কমে গেছে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে চাপ তৈরি করছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে রপ্তানিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে সতর্কতা অবলম্বন করছেন।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিআই)-সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও পরিচালনগত সক্ষমতা পুনরুদ্ধার না করে শুধু সুদের হার কমালে বেসরকারি খাতে ঋণগ্রহণের গতি ফিরবে না।
তিনি বলেন, সুদের হার কমানোর কারণ হলো ঋণ গ্রহণে উৎসাহিত করা। তবে ব্যবসায়ীরা তখনই বিনিয়োগ করবেন, যখন তারা পর্যাপ্ত চাহিদা, স্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগের ওপর যুক্তিসঙ্গত মুনাফা দেখতে পাবেন।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মতে, বিনিয়োগের গতি ফেরাতে শুধু ব্যাংকঋণ সস্তা করা যথেষ্ট নয়। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নীতিগত স্বচ্ছতাও প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে উন্নতি না হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের গতি আরও দীর্ঘ সময় ধরে মন্থর থাকতে পারে।