
ইবি রিপোর্ট
দেশের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে একসঙ্গে তিন ধরনের সুবিধা দিয়েছে সরকার। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার অর্থায়ন, সোলার সরঞ্জাম আমদানিতে কর ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা এবং বাড়তি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা ৫০ পয়সা মূল্য নির্ধারণ—এই তিন সিদ্ধান্তে রুফটপ সোলারে বিনিয়োগের সুযোগ আগের চেয়ে বাড়ল।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ১৪ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের জন্য গঠিত ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিলের ৫০০ কোটি টাকা করে পাবে অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেড (আইডিসিওএল), পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং বাংলাদেশ অবকাঠামো অর্থায়ন তহবিল লিমিটেড (বিআইএফএফএল)। সরকার এসব প্রতিষ্ঠানকে ০ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে অর্থ দেবে। পরে প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ বার্ষিক সুদে ঋণ দিতে পারবে। ঋণের মেয়াদ হবে ১০ বছর, এর মধ্যে এক বছর থাকবে রেয়াতকাল।
এই অর্থায়নের আওতায় নেট মিটারিং রুফটপ সোলার, সোলার হোম সিস্টেম, শিল্প পর্যায়ের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র, সৌরচালিত সেচ পাম্পের পাশাপাশি ইনভার্টার, ডিজিটাল মিটার ও ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থাও রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের জন্য বরাদ্দ ১ হাজার কোটি টাকা পুনর্বিন্যাস করে এই তহবিলে দেওয়া হয়েছে। বাকি ৫০০ কোটি টাকা এসেছে সরকারের পরিচালন তহবিল থেকে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সোলার সরঞ্জাম আমদানিতে বড় ধরনের করছাড়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ১৬ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে সামগ্রিক কর ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ১৮০ দিন কার্যকর থাকবে।
এর আগে ৮ জুনের বাজেটে সোলার সরঞ্জামের আমদানি শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণ শুল্ক প্রত্যাহার করা হলেও ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর এবং ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর ছিল। ফলে মোট কর দাঁড়িয়েছিল ১৭ শতাংশ। নতুন সিদ্ধান্তে মূল্য সংযোজন কর, অগ্রিম আয়কর, সম্পূরক শুল্কসহ অবশিষ্ট করও প্রত্যাহার করা হয়েছে। সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা, পর্যবেক্ষণ সরঞ্জাম এবং স্টিল-অ্যালুমিনিয়ামের কাঠামো এ সুবিধার আওতায় থাকবে। বাণিজ্যিক আমদানিকারকেরাও এবার এই সুবিধা পাবেন।
সোলার থেকে উৎপাদিত বাড়তি বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণেও প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের ১ সেপ্টেম্বরের প্যাকেজ অনুযায়ী, ব্যাটারিসহ রুফটপ সোলার ব্যবস্থায় উৎপাদিত বিদ্যুতের সর্বোচ্চ উৎপাদন ব্যয় ধরা হয়েছে প্রতি ইউনিট ৮ টাকা। এর সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা ও ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যোগ করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা বাড়তি বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা।
তবে এ সুবিধার জন্য সময়সীমা রয়েছে। ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সোলার ব্যবস্থা স্থাপন করে গ্রিডে বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে। নির্ধারিত মূল্য ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। অর্থাৎ উৎপাদিত বিদ্যুতের আগে নিজের প্রয়োজন মেটানো যাবে, এরপর বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করে নির্ধারিত মূল্য পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
সরকারের এই সুবিধা শুধু শিল্পকারখানায় সীমিত নয়। বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মার্কেট ও করপোরেট ভবনের উপযুক্ত ছাদেও সোলার ব্যবস্থা স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। দেশের জমির সীমাবদ্ধতার কারণে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর একটি পথ হিসেবে সামনে এসেছে। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইতিমধ্যে ১ গিগাওয়াটের বেশি রুফটপ সোলার স্থাপন হয়েছে।
তবে সুবিধা নেওয়ার আগে সিস্টেমের সক্ষমতা, ব্যাটারি, ইনভার্টার, প্যানেলের মান, কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং নেট মিটারিংয়ের শর্ত ঠিকভাবে মানতে হবে। সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও ইনভার্টারসহ সরঞ্জামে বিএসটিআই ও টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত কারিগরি মান অনুসরণ করতে হবে। আবেদন ও সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার এবং সংশ্লিষ্ট বিতরণ কোম্পানির কার্যালয় থেকে তথ্য নেওয়া যাবে।
ঋণের সুবিধা, আমদানি কর কমানো এবং বাড়তি বিদ্যুতের নির্ধারিত মূল্য—তিনটি পদক্ষেপ একই সময়ে কার্যকর হওয়ায় রুফটপ সোলারে বিনিয়োগের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন এর বাস্তব সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে সুবিধাগুলো কতটা সহজে গ্রাহকের কাছে পৌঁছায় এবং নির্ধারিত কারিগরি ও নেট মিটারিং ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়।
পাঠকের মন্তব্য