
ইবি রিপোর্ট
একসময় সন্ত্রাসের আতঙ্কে কাঁপত চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা। সন্ধ্যা নামলেই সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হতো ভয়। কখন কোথায় কী ঘটে যায়, সেই শঙ্কা ছিল মানুষের নিত্যসঙ্গী। সেই সময়ে সন্ত্রাস দমনে কঠোর অবস্থান নিয়ে আলোচনায় আসেন আলমডাঙ্গা থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী জালাল উদ্দীন আহমেদ।
পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে একের পর এক সন্ত্রাসীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে থাকে। প্রতিটি ঘটনার পর সন্ত্রাসকবলিত জনপদটিতে যেন স্বস্তির আবহ তৈরি হতে থাকে। দীর্ঘদিনের আতঙ্ক কাটিয়ে আলমডাঙ্গার মানুষ ধীরে ধীরে নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরে পেতে শুরু করেন।
সন্ত্রাসবিরোধী এই অভিযানে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সন্ত্রাসী সংগঠন ‘জনযুদ্ধ’। তাদের রোষ গিয়ে পড়ে কাজী জালাল উদ্দীন আহমেদের ওপর। তাঁকে হত্যার জন্য তাঁর মাথার দাম ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে সংগঠনটি।
কিন্তু সেই হুমকিতেও দমে যাননি কাজী জালাল। সন্ত্রাসের কাছে মাথা নত না করে বরং আরও দৃঢ়ভাবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন তিনি।
সন্ত্রাস দমনে একের পর এক অভিযান পরিচালনার ফলে কাজী জালাল উদ্দীন আহমেদ অল্প সময়ের মধ্যেই সন্ত্রাসীদের কাছে আতঙ্কের প্রতীক হয়ে ওঠেন। একের পর এক সন্ত্রাসীর পতন ঘটতে থাকে। মোট কতজন সন্ত্রাসী সেই সময়ে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছিল, সেই সংখ্যা এখন আর মনে নেই—তবে তাদের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আলমডাঙ্গার মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরে আসার বিষয়টি।
মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সন্ত্রাসীদের কাছে কঠোর ওসি হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে সাধারণ মানুষের কাছেও তিনি হয়ে ওঠেন আস্থার একজন পুলিশ কর্মকর্তা।
দীর্ঘদিনের রক্তাক্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত আলমডাঙ্গা ধীরে ধীরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশের দিকে ফিরতে থাকে।
কাজী জালাল উদ্দীন আহমেদের কাজের ধরনও ছিল কিছুটা ব্যতিক্রমী। তিনি একাধিক মোবাইল সিম ব্যবহার করতেন এবং সেগুলো একটি গোপন ব্যাগে রাখতেন।
বিভিন্ন নম্বর ও পরিচয় ব্যবহার করে তিনি সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। কখনও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতেন, আবার কখনও তাদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করতেন। এরপর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আত্মগোপনে থাকা সন্ত্রাসীদের কৌশলে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে আলমডাঙ্গায় নিয়ে আসতেন।
সন্ত্রাস দমনে তাঁর এই কৌশল ও তৎপরতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
কাজী জালালের ভূমিকা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আলমডাঙ্গার সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন কাজেও তাঁর ভূমিকার কথা উঠে আসে।
আলমডাঙ্গা থানা জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল। চারদিক উন্মুক্ত থাকা থানা কম্পাউন্ডকে প্রাচীর দিয়ে ঘিরে থানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন তিনি। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেন থানা মসজিদ মার্কেট।
তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল নৈতিক অবস্থান।
তিনি বলতেন, ‘দুইটা বিষয়ের সঙ্গে কখনও আপস করবেন না। সন্ত্রাসের সঙ্গে কোনো আপস নেই, ঘুষের সঙ্গেও কোনো আপস নেই।’
এই বক্তব্য তাঁর দায়িত্ব পালনের দর্শনেরও প্রতিফলন ছিল। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তিনি যেমন কঠোর ছিলেন, তেমনি ঘুষ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধেও ছিলেন আপসহীন।
একসময় যে আলমডাঙ্গার মানুষ সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হতে ভয় পেতেন, যে জনপদ দীর্ঘদিন সন্ত্রাস ও রক্তপাতের আতঙ্কে ছিল, সেই মানুষের মধ্যেই ধীরে ধীরে নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরে আসে।
প্রায় আড়াই বছর আলমডাঙ্গা থানায় দায়িত্ব পালনের পর ২০০৯ সালে বদলি হয়ে যান কাজী জালাল উদ্দীন আহমেদ। কর্মকর্তারা বদলি হন, দায়িত্বের চেয়ার বদলে যায়, সময়ও এগিয়ে যায়। কিন্তু কিছু মানুষের কর্ম একটি জনপদের মানুষের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন থেকে যায়।
কাজী জালাল উদ্দীন আহমেদ তেমনই একজন বলে তাঁকে স্মরণ করেন আলমডাঙ্গার মানুষ।
সন্ত্রাসীদের কাছে তিনি ছিলেন কঠোর এক পুলিশ কর্মকর্তা, আর সাধারণ মানুষের কাছে নিরাপত্তা ও আস্থার প্রতীক। তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়কার সেই ভূমিকার স্মৃতি আজও আলমডাঙ্গাবাসীর কাছে অমলিন।
কাজী জালাল উদ্দীন আহমেদ সংস্কৃতিমনা হিসেবেও পরিচিত। পারিবারিক জীবনেও তিনি সফল। তাঁর স্ত্রী সরকারি চাকরি করেন। পৈতৃকভাবে বিত্তশালী পরিবারের সন্তান কাজী জালাল দুই কন্যাসন্তানের জনক। তাঁর দুই মেয়েই এমবিবিএস চিকিৎসক।
২০২৫ সালে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন তিনি। তবে চাকরি থেকে অবসর নিলেও আলমডাঙ্গার মানুষের স্মৃতি থেকে অবসর নেননি কাজী জালাল উদ্দীন আহমেদ।
একজন পুলিশ কর্মকর্তার কর্মজীবন শেষ হয় বদলি, পদোন্নতি কিংবা অবসরের মধ্য দিয়ে। কিন্তু মানুষের নিরাপত্তা, আস্থা ও স্মৃতির সঙ্গে যে সম্পর্ক তৈরি হয়, সেটি অনেক দীর্ঘস্থায়ী।
আলমডাঙ্গার মানুষের কাছে কাজী জালাল উদ্দীন আহমেদের গল্প তাই শুধু একজন পুলিশ কর্মকর্তার কর্মজীবনের গল্প নয়; এটি সাহস, দায়িত্ববোধ, নৈতিক অবস্থান এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার এক অধ্যায়ের স্মৃতি।
পাঠকের মন্তব্য