
ইবি রিপোর্ট
প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ ও মানবিক জনশক্তি গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
তিনি বলেছেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় আলাদাভাবে একই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় অনেক ক্ষেত্রে ওভারল্যাপিং ও ডুপ্লিকেশন তৈরি হচ্ছে। এতে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর নভো থিয়েটারে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের ইনোভেশন ফেয়ারে ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল ৪.০: এমপাওয়ারিং ইয়ুথ থ্রু টেকনোলজিক্যাল অ্যান্ড এডুকেশনাল ইনোভেশন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কথা বলা হলেও বর্তমানে আমরা প্রযুক্তির দিকে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকে পড়েছি। প্রযুক্তিকে সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে মানবিক গুণাবলি, চিন্তাশক্তি ও বিজ্ঞান শিক্ষার বিকাশেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, শিশুদের ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে এআই ও প্রযুক্তি শিক্ষার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, যুব ও ক্রীড়া, শিক্ষা এবং প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরের কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রেই সাইলো ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে একই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় তৈরির চেষ্টা চলছে। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রকল্প বাস্তবায়ন, একই ধরনের প্রকল্পের ডুপ্লিকেশন বন্ধ এবং সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ ফল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
দেশের কারিগরি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোথাও প্রশিক্ষক নেই, কোথাও শিক্ষার্থী নেই, আবার কোথাও শিক্ষার্থী থাকলেও দক্ষ ও ভালো প্রশিক্ষকের সংকট রয়েছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ)সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ের কার্যক্রমেও যথেষ্ট সমন্বয় নেই। এসব সমস্যা সমাধানে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে কী ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি হবে, তা বিবেচনা করে প্রশিক্ষণের বিষয় নির্ধারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অ্যাকাডেমিয়া, ব্যবসা খাত এবং সরকারকে একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, যেসব উপজেলায় টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি) নেই, সেখানে ৩২৯টি টিটিসি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জমি অধিগ্রহণসহ কিছু জটিলতা থাকলেও এ নিয়ে কাজ এগিয়ে চলছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার স্থাপনের আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তবে শুধু নতুন টিটিসি স্থাপন করলেই হবে না, বিদ্যমান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে কার্যকর করার ওপরও গুরুত্ব দেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ প্রশিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে এগুলোকে শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
গ্রামাঞ্চলের তরুণদের প্রযুক্তি প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে সরকারি টিটিসির পাশাপাশি সরকার ও এনজিওর সহযোগিতায় প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। এসব প্ল্যাটফর্মে তরুণরা বিনামূল্যে কম্পিউটার ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনের পর আয় করার সুযোগও তৈরি হবে বলে জানান তিনি।
শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বই পড়া ও লেখার অভ্যাস ধরে রাখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করে বই পড়া ও লেখার বিকল্প তৈরি করা যাবে না। কগনিটিভ ডেভেলপমেন্ট বা জ্ঞানীয় বিকাশের জন্য পড়া ও লেখার কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও তরুণদের মধ্যে তৈরি করতে হবে।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে জিডিপির ২ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সরকার ধীরে ধীরে এই বরাদ্দ বাড়ানোর পক্ষে। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু তথ্য মুখস্থ করা নয়। বরং শিক্ষার্থীদের কীভাবে চিন্তা করতে হয় এবং কোনো বিষয়ে গভীরভাবে প্রবেশ ও বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা তৈরি করাই উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ, চিন্তাশক্তি ও জ্ঞানচর্চাকে গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, সমন্বিত পরিকল্পনা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং শিল্প খাতের চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই ভবিষ্যতের দক্ষ ও মানবিক জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব। এ জন্য সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা খাত এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
পাঠকের মন্তব্য