
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশের আমদানি ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব করতে নতুন ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬–২০২৯’ জারি করেছে সরকার। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। নতুন নীতিটি ২০২৬ সাল থেকে ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
নতুন আমদানি নীতিতে ব্যবসায়ীদের জন্য আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা, নীতিগত স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন নীতিতে পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস, আমদানির শর্ত, প্রয়োজনীয় সনদ, পণ্যের উৎপত্তি দেশ নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধিমালা অনুসরণের বিষয়গুলো আরও সুসংগঠিত করা হয়েছে। এতে আমদানিকারকদের নিয়মকানুন সম্পর্কে স্পষ্টতা বাড়বে এবং ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
চুক্তির মাধ্যমে আমদানিতে মূল্যসীমা থাকছে না
নতুন আমদানি নীতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো পণ্যের মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে ছাড়। এখন ঋণপত্র বা এলসি খোলার পাশাপাশি কোনো মূল্যসীমা ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে পণ্য আমদানি করতে পারবেন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আমদানিকারকেরা।
আগের ২০২১–২০২৪ সালের আমদানি নীতিতেও এলসি ছাড়া চুক্তির মাধ্যমে পণ্য আমদানির সুযোগ ছিল। তবে সে ক্ষেত্রে বিভিন্ন পণ্য ও খাতের জন্য নির্দিষ্ট সীমা ও শর্ত ছিল। নতুন নীতিতে সেই সুযোগ আরও বিস্তৃত করা হয়েছে।
৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ
মোটরসাইকেল আমদানির ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নীতি অনুযায়ী, সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় সর্বোচ্চ ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানি করা যাবে।
এর আগে সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় ১৬৫ সিসির বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেল আমদানিতে বিধিনিষেধ ছিল। নতুন নীতির ফলে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ল।
ফ্রি ট্রেড জোন ও বন্ডেড ওয়্যারহাউজ
নতুন আমদানি নীতিতে ফ্রি ট্রেড জোন ও সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের অবকাঠামো গড়ে উঠলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিতে বাড়বে সুবিধা
এফটিএ, সেপা ও ইপিএসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির আওতায় সুবিধা গ্রহণের বিষয়েও নতুন নীতিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব চুক্তির মাধ্যমে শুল্ক সুবিধা গ্রহণ, নতুন বাজারে প্রবেশ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে পণ্যের ‘কান্ট্রি অব অরিজিন’ বা উৎপত্তি দেশ নির্ধারণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে পণ্যের উৎস সম্পর্কে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় সুবিধা গ্রহণ সহজ হতে পারে।
আন্তর্জাতিক মান অনুসরণে জোর
নতুন নীতিতে আমদানি করা পণ্যের মান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মান ও কারিগরি বিধিমালা অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে টেকনিক্যাল ব্যারিয়ার্স টু ট্রেড, কোডেক্স অ্যালিমেন্টেরিয়াস এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের মানদণ্ড অনুসরণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এর ফলে মানসম্পন্ন পণ্য আমদানি নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের নীতিগত ও কারিগরি সামঞ্জস্য আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রবাসী বিনিয়োগ ও রফতানিমুখী শিল্পে সুবিধা
প্রবাসী বাংলাদেশিদের শিল্প খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতেও নতুন নীতিতে আমদানি সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। অনুমোদিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে রফতানি বহুমুখীকরণ এবং উচ্চমূল্য সংযোজনসম্পন্ন পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণ আমদানির সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে এসব সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে নতুন আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬–২০২৯ শুধু পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, রফতানি সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সমন্বিত একটি ব্যবসাবান্ধব কাঠামো তৈরির দিকে গুরুত্ব দিয়েছে।
নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আমদানি আরও সহজ হতে পারে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও রফতানি সম্প্রসারণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য