
কাজী মারুফুল ইসলাম
জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষ নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেছে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষে অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনৈতিক টানাপোড়েন সংসদীয় দর-কষাকষির গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজপথেও প্রভাব ফেলছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল—নতুন বাংলাদেশ সহনশীল, গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগোবে—সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই প্রত্যাশার সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই বছরের শেষভাগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা সামনে এসেছে। ফলে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কি রাজনৈতিক দলগুলোর দখলদারি ও সংঘাতের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠবে, নাকি তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিযোগিতামূলক ও সহনশীল গণতন্ত্র পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করবে?
দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধিশূন্য স্থানীয় সরকার
দেশের অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রায় দুই বছর ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই। বেশির ভাগ ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা বর্তমানে সরকার নিয়োগ করা প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের যে কাঠামো থাকার কথা, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আগস্টের দ্বিতীয়ার্ধে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে অক্টোবরে প্রথম ধাপের ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভায় নির্বাচন হতে পারে। সব ধাপের নির্বাচন সম্পন্ন করতে ১০ থেকে ১২ মাস সময় লাগতে পারে।
দেশে বর্তমানে সাড়ে চার হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদ, প্রায় ৩৩০টি পৌরসভা, প্রায় ৪৯৫টি উপজেলা এবং ১৩টি সিটি করপোরেশন রয়েছে। দীর্ঘদিনের জনপ্রতিনিধিশূন্যতা পূরণে নির্বাচন আয়োজন জরুরি হলেও শুধু ভোট গ্রহণ করলেই স্থানীয় গণতন্ত্র কার্যকর হবে না—এ বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
তৃণমূল গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ
স্থানীয় সরকারকে গণতন্ত্র চর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিকদের অংশগ্রহণ, মতামত প্রদান এবং নিজেদের এলাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ তৈরি হলে জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়।
কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে যখন ক্ষমতা নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা ও বিভাজন তৈরি হয়, তখন কার্যকর স্থানীয় সরকার সেই রাজনৈতিক চাপ কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন মত ও রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ থাকলে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হওয়ার পাশাপাশি জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণও বাড়তে পারে।
তবে স্থানীয় নির্বাচনকে শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে চলবে না। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা ও দায়িত্ব না থাকলে নির্বাচন শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সংস্কার ছাড়া নির্বাচন কতটা কার্যকর হবে?
স্থানীয় সরকার সংস্কারের বিষয়টিও তাই সামনে আসছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণসহ বিভিন্ন সুপারিশ করেছিল।
এসব সুপারিশের মধ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আইন ও কাঠামো সংস্কার এবং ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে প্রকৃত কর্তৃত্ব ও দায়িত্ব অর্পণের বিষয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় প্রশ্ন উঠছে, ক্ষমতাহীন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন হলে জনগণ আসলে কতটা ক্ষমতা পাবেন।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব স্পষ্ট না হলে নির্বাচনের পরও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরতা থেকে যেতে পারে। এতে নির্বাচিত পরিষদের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দলীয় প্রতীক না থাকলেও সংঘাতের শঙ্কা
এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নির্দলীয় প্রতীকের মাধ্যমে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে দুই দফায় দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলে দলীয় সংঘাত কমবে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়।
রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি প্রতীক ব্যবহার না করলেও প্রার্থী বাছাই, স্থানীয় সমর্থন এবং জোটের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। ফলে দলীয় প্রতীক না থাকলেও রাজনৈতিক বিভাজন নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে বিএনপি, জামায়াত-শিবিরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইবে। ফলে নির্দলীয় নির্বাচন হলেও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যে থাকবে, তা অনেকটাই স্পষ্ট।
নারী অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল পর্যায়ে নারী নেতৃত্বের বিকাশ ঘটেছে। অনেক নারী বর্তমানে স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
তবে অনলাইন হয়রানি, চরিত্রহনন, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং অর্থনির্ভর নির্বাচনী প্রচারণা নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ থাকলেও পরবর্তী রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কমে যাওয়ার যে আশঙ্কা রয়েছে, স্থানীয় নির্বাচনেও সেটি যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে—সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন
আইনগতভাবে যোগ্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের যেসব সদস্য ও সমর্থক আইনি যোগ্যতা পূরণ করেন এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান, তাদের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন নীতিগতভাবে যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ রাখার কথা বললেও কাগজে থাকা বিধান এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে যেন কোনো দূরত্ব তৈরি না হয়, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি জরুরি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য করতে তফসিল ঘোষণার আগেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণেও সরকারকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
নির্বাচন কমিশনকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি সুস্থ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, বিশেষ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।
অনলাইন প্রচারণাকেও নির্বাচনী ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অপপ্রচার, ভুয়া তথ্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অনলাইন হয়রানি ঠেকাতে কার্যকর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
সব মিলিয়ে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের একটি প্রক্রিয়া নয়; এটি নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় পরীক্ষা। নির্বাচন যদি শান্তিপূর্ণ, অবাধ, প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক হয়, তাহলে তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্র শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতেও আস্থা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে নির্বাচন যদি দখলদারি, পেশিশক্তি, অর্থের প্রভাব ও রাজনৈতিক সংঘাতের নতুন ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, তাহলে জুলাই অভ্যুত্থানের পর সহনশীল ও বহুত্ববাদী রাজনীতির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেমন হবে, তার ওপর শুধু তৃণমূলের গণতন্ত্র নয়, দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশের ভবিষ্যৎও অনেকাংশে নির্ভর করছে।
পাঠকের মন্তব্য