![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত কলম্বিয়ায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে আহত হয়েছেন অন্তত ৩ হাজার ৪৯৪ জন। এখনো ৪৯৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের সন্ধানে ধ্বংসস্তূপে দিন-রাত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
ভূমিকম্পে নিহতদের স্মরণে দেশটিতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। শোক চলাকালে সব সরকারি ভবন ও কূটনৈতিক মিশনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আবেলরদো দে লা এসপ্রিয়েলা।
গত সোমবার (১০ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটে চোকো প্রদেশের সান হোসে দেল পালমারের কাছে শক্তিশালী ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। গ্রিনিচ মান সময় অনুযায়ী তখন সময় ছিল সকাল ৭টা ৩৪ মিনিট। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০৭ কিলোমিটার গভীরে।
প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কিছুটা কম মনে হলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসস্তূপ থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বাড়তে থাকে। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি শতাব্দীতে কলম্বিয়ায় আঘাত হানা ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে প্রাণঘাতী।
নিখোঁজদের সন্ধানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব
ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পেরেইরা ও ক্যালির মতো বড় শহরের পাশাপাশি দুর্গম গ্রামীণ এলাকাতেও উদ্ধারকর্মীরা জীবিতদের সন্ধানে কাজ করছেন।
উদ্ধারকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে ভারী যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষিত সন্ধানী কুকুর এবং স্বেচ্ছাসেবীদের মানবশৃঙ্খল। অনেক জায়গায় ধ্বংসস্তূপ এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে যে, ভারী যন্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি উদ্ধারকর্মীদের হাত দিয়েও ধ্বংসাবশেষ সরাতে হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট দে লা এসপ্রিয়েলা বলেছেন, বর্তমানে সরকারের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হলো নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা। ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ জীবিত অবস্থায় আটকা পড়ে আছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে উদ্ধারকারীরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ধ্বংস হয়েছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি
ভূমিকম্পে কলম্বিয়ার অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। দেশটির ন্যাশনাল ইউনিট ফর ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্টের (ইউএনজিআরডি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পে ৯ হাজার ২১৫টি বসতবাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে।
এ ছাড়া আরও ৪৫ হাজার ৪৫৭টি বাড়ি ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপুল এই ক্ষয়ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে দেশটিতে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের কেন্দ্রের কাছাকাছি গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। ভালে দেল কাউকা প্রদেশের এল কায়রো এলাকায় স্থানীয় জরুরি সেবা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই অঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা নিয়ে বিতর্ক
ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ধার ও কারিগরি সহায়তার প্রস্তাব এসেছে। তবে উদ্ধারকারী দল গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের নীতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ইউএনজিআরডির পরিচালক ডেভিড সান্তিয়াগো তামায়ো জানিয়েছেন, কঠোর পরিচালনাগত মানদণ্ড বিবেচনায় সরকার যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, ইকুয়েডর ও এল সালভাদর থেকে কারিগরি উদ্ধারকারী দল মোতায়েনকে অগ্রাধিকার দেবে।
সরকারের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন কলম্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি আন্তর্জাতিক সহায়তা গ্রহণে আদর্শিক মাপকাঠি ব্যবহারের সমালোচনা করেন।
তবে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কলম্বিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দেশের সহায়তা প্রত্যাখ্যান করেনি। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের সহযোগিতা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
এরই মধ্যে মেক্সিকোর বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবী উদ্ধারকারী দল ‘ব্রিগাদা ইন্টারন্যাশনাল দে রেসকাটে তোপোস আজতেকা’ বুধবার ক্যালিতে পৌঁছেছে। দলটি স্থানীয় উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের সন্ধানে কাজ শুরু করেছে।
দুর্যোগের মাত্রা বাড়াচ্ছে দুর্গম এলাকা
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক এলাকা দুর্গম হওয়ায় উদ্ধারকাজে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। কোথাও সড়ক যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কোথাও বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জরুরি পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে। ফলে উদ্ধারকারী দল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে ভূমিকম্পের উপকেন্দ্রের কাছাকাছি গ্রামীণ এলাকাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বেশি হওয়ায় সেখানে নিখোঁজদের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। উদ্ধারকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, ধ্বংসস্তূপ পুরোপুরি সরানোর পর হতাহতের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।
তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক
ভূমিকম্পে প্রাণ হারানো মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা দিয়েছে। এ সময় জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার পাশাপাশি নিহতদের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে সরকার।
দেশটির বিভিন্ন শহরে স্বজনদের হারানো মানুষদের আহাজারি, ধ্বংসস্তূপের সামনে অপেক্ষমাণ পরিবারের সদস্য এবং উদ্ধারকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিস্থিতি।
এখন পর্যন্ত ২৬৫ জনের মৃত্যু, হাজারো মানুষের আহত হওয়া এবং ৪৯৬ জনের নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে কি না—সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো কলম্বিয়া।
পাঠকের মন্তব্য