![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত জুলাইয়ের আন্দোলন শেষ হয়নি। জনগণের অধিকার নিশ্চিত হওয়ার মধ্য দিয়েই জুলাইয়ের সার্থক পরিসমাপ্তি ঘটবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
শনিবার রাজধানীতে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক একটি প্রদর্শনী শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ধরে বিভিন্নভাবে মানুষের অধিকার হরণ করা হয়েছে। এ সময় অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অনেকে জীবন দিয়েছেন, অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, জেলে গেছেন এবং অসংখ্য মামলা মোকাবিলা করেছেন। শেষ পর্যন্ত জুলাইয়ে আবারও ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে এবং আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমীর বলেন, আন্দোলন দমনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের ওপর হামলার পর পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হয়। এরপর ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনা আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। একই সময়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হতাহতের ঘটনা ঘটে এবং ১৮ জুলাই থেকে ধারাবাহিকভাবে হত্যাকাণ্ড চলতে থাকে বলে তিনি দাবি করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৩ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তার দাবি, ওই সময় সেনাবাহিনীর সাধারণ কর্মকর্তা ও সদস্যদের একটি অংশ জনগণের ওপর অস্ত্র ব্যবহারে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখনও আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থানে ছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াত আমীর আরও দাবি করেন, ৩ ও ৪ আগস্ট ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং সে সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে লাশ গুম করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের দিনও আশুলিয়ায় মানুষকে অর্ধমৃত অবস্থায় ট্রাকে তুলে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রসঙ্গ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সাময়িক রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলেও সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার পরিচয় দিতে পারেননি।
তিনি জাতীয় সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার কথাও তুলে ধরেন। তার ভাষ্য, দীর্ঘ সময় আলোচনা করে একটি চার্টার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। বিশেষ করে নিজেদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতভেদ তৈরি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিচারপতি নিয়োগ ও নির্বাচন কমিশন গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো রাজনৈতিক দল বা দলের কর্তৃত্বের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। এসব প্রতিষ্ঠান নির্দলীয় কাঠামোর মাধ্যমে গঠনের পক্ষে তাদের অবস্থান বলে জানান তিনি।
সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের বৈধতা নিশ্চিত করতে সংস্কার পরিষদ বা গণপরিষদের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন জামায়াত আমীর। তিনি বলেন, এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একসময় ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। তবে নির্বাচন ও সরকার গঠনের পর সেই অবস্থান পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বর্তমান সরকার গঠনের পরও পুরোনো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তে একই ধরনের দুর্নীতি ও দলীয়করণ চলছে বলেও অভিযোগ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তার প্রশ্ন, এত মানুষের জীবন, ত্যাগ ও আত্মত্যাগের পর যদি কেবল একটি রাজনৈতিক দলকে সরিয়ে একই ধরনের আরেকটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হলো।
তিনি বলেন, সংসদের ভেতরে সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানানো হলেও তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। ফলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকার আদায়ের কথা জানান তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদে তারা প্রতিকার ও ন্যায়বিচার পাননি। জনগণের অধিকারও সেখানে যথাযথভাবে স্বীকৃতি পায়নি বলে তিনি দাবি করেন। তাই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে থাকার ঘোষণা দেন জামায়াত আমীর।
তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি আবারও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা—জনগণের অধিকার, জবাবদিহি, রাজনৈতিক সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা—বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পাঠকের মন্তব্য