![]()
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় পরিচালিত এই তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ, নিবন্ধন বাতিল এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ রয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই আইন এবং পরবর্তী সংশোধনীগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই প্রণয়ন করা হয়েছিল। ফলে নিজেদের প্রণীত আইনেই এখন দলটির বিচার ও সম্ভাব্য নিষিদ্ধ হওয়ার প্রশ্ন সামনে এসেছে।
ট্রাইব্যুনাল-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন প্রণয়ন করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। পরে ২০১৩ সালে আইনের ২ নম্বর ধারা সংশোধন করে ‘অরগানাইজেশন’ বা ‘সংগঠন’ শব্দটি যুক্ত করা হয়। বর্তমান সরকার সেই আইনের আওতায় রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তদন্ত করছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আনসার উদ্দিন খান পাঠান জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করলে তদন্ত শুরু হয়। তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
২০২৫ সালের ১০ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধন করে জারি করা অধ্যাদেশে রাজনৈতিক দল, অঙ্গসংগঠন বা সংশ্লিষ্ট কোনো সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া হয়। সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, কোনো সংগঠন মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন, সহায়তা, উসকানি, ষড়যন্ত্র বা সহযোগিতার সঙ্গে জড়িত থাকলে ট্রাইব্যুনাল তার কার্যক্রম স্থগিত বা নিষিদ্ধ, নিবন্ধন বা লাইসেন্স বাতিল এবং সম্পত্তি জব্দ করার নির্দেশ দিতে পারবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি বলেছেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। তার ভাষায়, তদন্ত শেষে খুব শিগগিরই দলটিকে বিচারের কাঠগড়ায় আনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত। আদালতের রায়ে যদি দলটিকে নিষিদ্ধ না করা হয়, তাহলে তারা রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে পারবে। বিষয়টি সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, তদন্তে যদি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের ভিত্তি পাওয়া যায় এবং তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে আসে, তাহলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, সংগঠনের বিচার ও নিষিদ্ধ করার আইনি ভিত্তিও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই তৈরি হয়েছিল।
সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় রাজনৈতিক দলের বিচার সম্ভব। তবে দলকে কারাদণ্ড দেওয়া সম্ভব না হলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ, নিবন্ধন বাতিল কিংবা সম্পদ বাজেয়াপ্তের মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ মনে করেন, তদন্তে প্রমাণ করতে হবে দলীয় সিদ্ধান্ত বা সাংগঠনিকভাবে এসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল কি না। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই বিচার রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি বা নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগকে দূরে রাখার কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, নিষিদ্ধ হলেও নতুন নামে রাজনৈতিক দল গঠনের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
উল্লেখ্য, মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’-এর ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ৯২৬ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগও চলমান তদন্তের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে।
পাঠকের মন্তব্য