![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) দীর্ঘদিনের পুঁজিবাজার মন্দার প্রভাবে তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েছে। সরকার, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা অর্থের বড় অংশ বিনিয়োগ করেও বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি মূলধন ক্ষয়ের মুখে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে ব্যাংকঋণের বিপরীতে জমে থাকা প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার সুদ সময়মতো পরিশোধ করতেও ব্যর্থ হয়েছে আইসিবি।
প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে আইসিবির মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা হলেও বর্তমান বাজারমূল্য নেমে এসেছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকায়। ফলে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগমূল্য হ্রাস পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এদিকে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া ৩ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিলের মেয়াদ শেষ হলেও তা পরিশোধ করতে পারেনি আইসিবি। এ কারণে গ্যারান্টির মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়ানোর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
আইসিবির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মূলধনী মুনাফা, লভ্যাংশ ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের আয় বর্তমানে সুদ ব্যয়, পরিচালন ব্যয় এবং প্রভিশন সংক্রান্ত ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম। ফলে প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে লোকসানের মুখে পড়ছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে আইসিবি ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকা রেকর্ড লোকসান করেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৮৮ কোটি টাকা। শেষ প্রান্তিকের হিসাব যুক্ত হলে এই লোকসান আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংকট কাটাতে আইসিবি মূলধন পুনর্গঠন, রাইট শেয়ার ইস্যু এবং রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর ঋণকে শেয়ারে রূপান্তরের পরিকল্পনা করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে সুদের চাপ কমবে এবং প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় মুনাফার ধারায় ফিরতে পারবে। তবে এ জন্য সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
গত ১১ জুন অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে আইসিবি জানিয়েছে, পুঁজিবাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারের প্রত্যাশা অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে উচ্চ সুদে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে বাজারে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি মন্দার কারণে শেয়ারের দাম ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
আইসিবির ভাষ্য, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল ফেরত দিতে হলে বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করতে হবে। এতে বাজারে বড় ধরনের বিক্রির চাপ তৈরি হয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আইসিবি রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং সরকারের কাছ থেকে আরও ১ হাজার কোটি টাকা সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা উচ্চ সুদের ঋণ পরিশোধে এবং বাকি অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
আইসিবির কর্মকর্তাদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটির তহবিল ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি চালু হয়েছে। পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানো, ব্লক মার্কেট থেকে শেয়ার কেনা বন্ধ এবং নিয়মিত পর্যালোচনার ফলে আগের তুলনায় ক্ষতির হার কমেছে। তবে অতীতের বড় ক্ষতির প্রভাব এখনও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে আইসিবির পরিচালন ব্যয় বছরে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা, কিন্তু শুধু সুদ পরিশোধেই প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। ফলে স্বল্পসুদে নতুন অর্থায়ন কিংবা ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
পাঠকের মন্তব্য