![]()
বাংলাদেশের চিকিৎসা অঙ্গনের অন্যতম পরিচিত নাম অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক ও লেখক হিসেবে দেশের স্বাস্থ্যখাতে অবদান রেখে চলেছেন তিনি। বর্তমানে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগীপ্রতি মাত্র ৩০০ টাকা ভিজিট নেওয়ার পাশাপাশি অনেক দরিদ্র রোগীর কাছ থেকে ভিজিটও নেন না। প্রয়োজন হলে ব্যয়বহুল পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিভিন্ন হাসপাতালে ছাড়ের ব্যবস্থাও করে দেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সিন্ডিকেট তার আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপকের নিয়োগ বাতিল এবং ওই পদে পাওয়া বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর তাকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক চিকিৎসক, সাবেক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ তার সততা, মানবিকতা এবং অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিরুৎসাহিত করার চর্চার প্রশংসা করেছেন।
কেন বাতিল হলো ইমেরিটাস পদ
বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস আদেশে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ২০ জুন অনুষ্ঠিত ৯২তম সিন্ডিকেট সভায় আলোচ্যসূচির বাইরে ‘ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ অধ্যাদেশ’ সংশোধন করে তাকে পুনরায় আজীবন মেয়াদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। যেহেতু সেই প্রক্রিয়া বিধিবহির্ভূত ছিল, তাই নিয়োগটি অনুমোদনযোগ্য নয়।
এছাড়া ওই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে উত্তোলিত বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর প্রায় দুই বছর তিনি নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত হননি এবং শিক্ষাদান বা গবেষণামূলক কার্যক্রমে অংশ নেননি। তবে এ সময় তিনি ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে এ বাবদ প্রায় ১৪ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার ডা. আবদুল্লাহর
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ।
তিনি বলেন, তিনি নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন, তবে তাকে কোনো ক্লাস বা একাডেমিক দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
তার ভাষায়, “ইমেরিটাস অধ্যাপকদের ক্লাস দিতে হয়, একাডেমিক মিটিংয়ে ডাকতে হয়। আমাকে ক্লাস বা রুটিনই দেওয়া হয়নি। তাহলে আমি কীভাবে ক্লাস নেব?”
তিনি আরও বলেন, বেতন-ভাতার হিসাবও সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। তার দাবি, অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক হিসেবে প্রাপ্য পেনশনের অর্থও ওই হিসাবের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, যা সঠিক নয়।
‘সম্মানিত মানুষকে অসম্মান করা উচিত হয়নি’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন বলেন, ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি বিধিগত কোনো ত্রুটি থেকেও থাকে, সেটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়; ব্যক্তির নয়।
তার মতে, ডা. এ বি এম আবদুল্লাহকে অযোগ্য বলা হয়নি, বরং নিয়োগের প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একজন সম্মানিত ব্যক্তিকে এভাবে বিব্রত করা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে না।
দীর্ঘ চার দশকের চিকিৎসা ও শিক্ষাজীবন
১৯৫৪ সালে জামালপুরের ইসলামপুরে জন্মগ্রহণ করেন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ। ১৯৭৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের পর কর্মজীবনের শুরুতে গ্রামীণ পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা দেন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগ দেন এবং পাঁচ বছর সৌদি আরবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানস থেকে এমআরসিপি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৫ সালে তৎকালীন পিজি হাসপাতাল, বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়ে পরে মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান এবং টানা তিন মেয়াদে মেডিসিন অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি ১০টি বই রচনা করেছেন। পাশাপাশি বিশ্বখ্যাত Davidson’s Principles and Practice of Medicine এবং Kumar & Clark’s Clinical Medicine গ্রন্থের আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
গবেষণা ও চিকিৎসা শিক্ষায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ইউজিসি অ্যাওয়ার্ড, একুশে পদক এবং বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক ফেলোশিপ লাভ করেন। ২০১৯ সালে ইউজিসি অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পাশাপাশি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবেও সচিব পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেন।
২০২২ সালে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়। পরে পুনরায় আজীবন মেয়াদে নিয়োগ পেলেও সম্প্রতি সেই নিয়োগ বাতিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
পাঠকের মন্তব্য