![]()
রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণে ২০২৫-২০৪৫ মেয়াদের জন্য প্রণয়নাধীন হালনাগাদকৃত সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (ইউআরএসটিপি) কিলোমিটারপ্রতি ৬ দশমিক ২৭ টাকা হারে যানজট শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও ট্রাকের ওপর এই শুল্ক আরোপ করা হবে। তবে এটি রাজধানীর সব সড়কে নয়; কেবল মেট্রোরেল, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) অথবা উন্নত গণপরিবহন সুবিধাসমৃদ্ধ করিডোরে কার্যকর হবে।
বর্তমানে ঢাকায় উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল করিডোরকে এ ধরনের শুল্ক আরোপের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এছাড়া নির্মাণাধীন দুটি মেট্রোরেল, পরিকল্পনাধীন আরও তিনটি মেট্রোলাইন, নতুন দুটি মেট্রোরেল ও পাঁচটি মনোরেল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সেগুলোর আশপাশের সড়কেও এই ব্যবস্থা চালু হতে পারে।
এ ছাড়া বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত নির্মাণাধীন বিআরটি করিডোর এবং ভবিষ্যতে চালু হতে যাওয়া কোম্পানিভিত্তিক উন্নত বাসসেবার রুটগুলোতেও যানজট শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর শুল্ক আদায়
যানজট শুল্ক আদায়ে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন (আরএফআইডি) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। নির্ধারিত সড়কে আরএফআইডি রিডার স্থাপন করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যানবাহন থেকে শুল্ক কেটে নেওয়া হবে।
পুরো ব্যবস্থাপনা তদারকি করবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)।
এ ছাড়া ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ ও ডিটিসিএর যৌথ ব্যবস্থাপনায় একটি আধুনিক ট্রাফিক কন্ট্রোল সেন্টার গঠনেরও সুপারিশ করা হয়েছে। এতে ডিএমপি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও দুর্ঘটনা ব্যবস্থাপনা দেখবে, আর ডিটিসিএ পরিচালনা করবে যানজট শুল্ক ও বাস পরিচালনা ব্যবস্থা।
ভয়াবহ যানজটের চিত্র
বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে ঢাকার সড়কে যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২১ কিলোমিটার। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটারে।
বিশ্বব্যাংকের আরেক গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজধানীর যানজটের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি ৭৩টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নিয়মিত যানজটের কারণে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে।
অর্থায়নের নতুন উৎস
ইউআরএসটিপির খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৪৫ সাল পর্যন্ত প্রস্তাবিত পরিবহন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। সেই অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ যানজট শুল্ক থেকে সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থাৎ, যানজট কমানোর পাশাপাশি এই শুল্ককে গণপরিবহন ও সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থায়নের উৎস হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক বলেন, এ ধরনের আধুনিক ব্যবস্থা চালুর আগে সব যানবাহনের নির্ভুল ডিজিটাল নিবন্ধন, ট্রান্সপন্ডার প্রযুক্তি এবং একটি সমন্বিত ডেটাবেজ গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, যানজটের মাত্রা ও সময়ভেদে শুল্কের হার পরিবর্তন করা উচিত। অফ-পিক সময়ে কম বা শূন্য শুল্ক এবং ব্যস্ত সময়ে বেশি শুল্ক আরোপ করলে সড়কে যানবাহনের চাপ সারা দিনে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। এই পদ্ধতিকে ‘ভেরিয়েবল মাশুল’ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তার মতে, যানজট শুল্ক থেকে আদায় করা অর্থ আবার গণপরিবহন আধুনিকায়ন ও সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নেই ব্যয় করা উচিত।
সরকারের অবস্থান
ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান বলেন, রাজধানীর যানজট কমাতে সরকার ইতোমধ্যে মনোরেল, বাস টার্মিনাল স্থানান্তর, ডেডিকেটেড বাস রুট এবং কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি জানান, যানজট শুল্ক আরোপও এই সমন্বিত পরিকল্পনারই একটি অংশ। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে বলে সরকারের আশা।
পাঠকের মন্তব্য