![]()
ছবি: রযটার্স
বিশ্বকাপের ফাইনালের আগে ব্যক্তিগত পুরস্কারের দৌড়ে যেমন উত্তেজনা থাকে, তেমনি এবারের আসরে আলোচনার কেন্দ্রেও উঠে এসেছে আরেকটি বিষয়—ফুটবলারদের পায়ের বুট। ১৯ জুলাই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়কের হাতে ট্রফি ওঠার আগে সর্বোচ্চ গোলদাতার হাতে তুলে দেওয়া হবে মর্যাদাপূর্ণ ‘গোল্ডেন বুট’ পুরস্কার। তবে চলতি টুর্নামেন্টের ম্যাচগুলো দেখে অনেকেই মজা করে বলছেন, এবারের আসরে পুরস্কারের নাম ‘গোলাপি বুট’ হলেও বোধহয় মানিয়ে যেত। কারণ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে অসংখ্য ফুটবলারের পায়ে দেখা যাচ্ছে উজ্জ্বল গোলাপি রঙের বুট।
এই প্রবণতা শুরু হয় টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচ থেকেই। মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচে দুই দলের শুরুর একাদশের ২২ জনের মধ্যে মাত্র তিনজন ছাড়া সবাই গোলাপি রঙের কোনো না কোনো শেডের বুট পরে মাঠে নামেন। এরপর থেকে কিলিয়ান এমবাপ্পে, এরলিং হলান্ডের মতো বিশ্বতারকা থেকে শুরু করে কেপ ভার্দে ও কুরাসাওয়ের খেলোয়াড়দের পায়েও একই ধরনের বুট দেখা গেছে। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই অ্যাডিডাস, নাইকি, পুমা, নিউ ব্যালান্স ও স্কেচার্সের মতো শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলো নতুন বুট বাজারে আনে। অ্যাডিডাস তাদের রঙের নাম দেয় ‘সোলার টার্বো’, পুমা রাখে ‘পয়জন পিঙ্ক’। নাম আলাদা হলেও রঙের মিল ছিল স্পষ্ট।
নিউ ব্যালান্সের ফুটবল পণ্যের প্রধান রব শেলডনের মতে, উজ্জ্বল রঙের বুট মাঠে খেলোয়াড়দের সহজে চোখে পড়তে সাহায্য করে। এতে সতীর্থদের দ্রুত খুঁজে পাওয়া যায়, আবার কোটি কোটি দর্শকের নজরও সহজে ব্র্যান্ডের লোগোর দিকে যায়। তিনি বলেন, আধুনিক ফুটবলাররা শুধু খেলোয়াড় নন, তারা নিজেরাও একেকটি ব্র্যান্ড। তাই এখন বুটের নকশায় প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি ব্যক্তিত্ব প্রকাশের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
নাইকিও একই ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ফুটওয়্যার বিভাগের পরিচালক ওডিঙ্গা নিমাকো বলেন, তারা এমন একটি রঙ খুঁজছিলেন, যা সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, খেলোয়াড় ও সাধারণ ক্রেতা—উভয়ের মধ্যেই গোলাপি রঙের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। এখন এই রঙ আর নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।
বিশ্বকাপে গোলাপি বুটের আধিক্যের পেছনে ফ্যাশন ও ভোক্তা প্রবণতারও প্রভাব রয়েছে। ২০২৪ সালের মে মাসেই ভোক্তা প্রবণতা বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ডব্লিউজিএসএন পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০২৬ সালে সবচেয়ে জনপ্রিয় রঙগুলোর একটি হবে ‘ইলেকট্রিক ফিউশিয়া’—গোলাপি ও বেগুনির মাঝামাঝি একটি উজ্জ্বল রঙ। প্রতিষ্ঠানটির মতে, মানুষের মধ্যে আত্মপ্রকাশ, দৃশ্যমানতা ও আশাবাদের চাহিদা বাড়বে। সেই পূর্বাভাসই যেন বিশ্বকাপের মাঠে বাস্তব রূপ পেয়েছে।
ডব্লিউজিএসএনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যবহৃত গোলাপি ফুটবল বুটের মধ্যে উজ্জ্বল গোলাপি রঙের বুটের অংশ প্রায় ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষক ম্যাডেলিন চ্যান্ট বলেন, খেলোয়াড়কেন্দ্রিক ক্রীড়া অর্থনীতিতে রঙ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পদ। এটি শুধু পণ্যকে আকর্ষণীয় করে তোলে না, বরং বুট, জার্সি ও অন্যান্য সরঞ্জামকে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীকেও পরিণত করে।
বিশ্বখ্যাত জুতা ডিজাইনার ক্রিশ্চিয়ান ট্রেসারের মতে, বড় বড় ব্র্যান্ডের একই ধরনের রঙ বেছে নেওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ বিপণন বিশেষজ্ঞ ও প্রবণতা বিশ্লেষকেরা প্রায় একই ধরনের তথ্য ও গবেষণা ব্যবহার করেন। ফলে তাদের সিদ্ধান্তেও মিল দেখা যায়।
তবে গোলাপি বুটের এই আধিপত্যের মধ্যেও কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। লিওনেল মেসি আলজেরিয়ার বিপক্ষে অ্যাডিডাসের বিশেষ সংস্করণের ‘এল উলতিমো ট্যাঙ্গো’ বুট পরে মাঠে নেমেছিলেন, যেখানে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা রঙের ছাপ ছিল। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচও পুমার বিশেষ তারকাখচিত সংস্করণের বুট ব্যবহার করেছেন। তবু সামগ্রিকভাবে এবারের বিশ্বকাপ যেন গোলাপি বুটের এক বিশাল প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে, যেখানে পারফরম্যান্সের পাশাপাশি ফ্যাশন ও ব্র্যান্ডিংও সমানভাবে আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য