
আহমেদ তোফায়েল
দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হলো ব্যাংকিং খাত। আর এই খাতের বিশাল একটি অংশ জুড়ে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অব্যবস্থাপনার ভারে এই ব্যাংকগুলো এখন ন্যূয়ে পড়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রত্যাশা ছিল, ব্যাংক খাতের জঞ্জাল পরিষ্কারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কিন্তু সরকারের ১৮০ দিন বা ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে দৃশ্যমান কোনো সংস্কার হয়নি। বরং শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং পর্ষদের অকার্যকারিতায় এই ব্যাংকগুলো এখন এক প্রকার স্থবিরতার কবলে পড়েছে।
একটি ব্যাংকের পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি হলো তার পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। কিন্তু দেশের বৃহত্তম সোনালী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান পদটি গত ২ মার্চ থেকে শূন্য। সাবেক অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর পদত্যাগের পর থেকে সাড়ে পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে সেখানে কোনো পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান নেই। একজন আমলার চলতি দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে ব্যাংকের বড় বড় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার বদলে ব্যাংকটি চলছে অনেকটা দায়সারা ও দৈনন্দিন রুটিন মাফিক।
সোনালী ব্যাংকের এই পরিস্থিতি যেন রাষ্ট্রায়ত্ত অন্যান্য ব্যাংকগুলোর অঘোষিত চিত্র। জনতা, অগ্রণী, রূপালী বা কৃষি ব্যাংক—প্রতিটি ক্ষেত্রেই একই সংকট। শীর্ষ পদগুলোতে কারা থাকছেন, আর কারা থাকছেন না—সেই অনিশ্চয়তা কর্মকর্তাদের মাঝে এক ধরনের ভীতি ও অনীহা তৈরি করেছে। ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়ার ফলে ব্যাংকের ভেতরকার কর্মচাঞ্চল্য প্রায় তলানিতে।
ঋণ বিতরণে নেতিবাচক প্রভাব:
স্থবিরতার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ঋণ বিতরণের পরিসংখ্যানে। সরকারি ব্যাংকগুলোর মূল লক্ষ্য থাকার কথা ছিল অর্থনীতিতে তারল্য প্রবাহ বজায় রাখা এবং উদ্যোক্তাদের ঋণ দিয়ে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সোনালী ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ১১ হাজার কোটি টাকা কমেছে। একইভাবে অগ্রণী ব্যাংকসহ অন্যান্য সরকারি ব্যাংকের ঋণ বিতরণেও কোনো উল্লম্ফন নেই।
বর্তমান এমডিরা জানেন না তাদের মেয়াদ কতদিন। ফলে বড় কোনো বিনিয়োগ বা ঋণ বিতরণের ঝুঁকি নিতে তারা ভয় পাচ্ছেন। এ কারণে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম এখন আমানত সংগ্রহ এবং সরকারি ট্রেজারি বিল বা বন্ডে বিনিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা সরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া প্রায় ভুলে গেছেন। এটি কেবল ব্যাংকের আয় কমাচ্ছে না, বরং সামগ্রিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনামলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তা রাতারাতি সারানো কঠিন—এটি সত্য। কিন্তু সংস্কারের পথে হাঁটার প্রাথমিক লক্ষণগুলোও কেন দেখা যাচ্ছে না, সেটিই বড় প্রশ্ন। মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর মতো অভিজ্ঞ আমলারাও এ পরিস্থিতিকে সরকারের ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে দেখছেন। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) ও অর্থ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সাবেক এ আমলা স্পষ্ট করে বলেছেন, ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে হলে কেবল ‘প্যারাসিটামল’ দিলেই চলবে না, বরং ‘কোরামিন’ জাতীয় কঠোর ব্যবস্থার প্রয়োজন।
বেসরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত মিলে ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। কিন্তু গত ছয় মাসে সেই ধরনের কোনো কার্যকর কাঠামোগত পরিবর্তন বা সংস্কার প্রস্তাব সামনে আসেনি। শুধু চেয়ারম্যান বা এমডি পরিবর্তনের মধ্যেই সংস্কারকে সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতা ব্যাংকিং খাতের সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
যোগ্য নেতৃত্বের আকাল:
সরকার সংশ্লিষ্ট মহলের তথ্যমতে, ব্যাংকগুলোতে নতুন এমডি বা চেয়ারম্যান নিয়োগে দেরি হওয়ার অন্যতম কারণ হলো যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্বের অভাব। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক বিবেচনায় ও দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়ার ফলে ব্যাংকের মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের ওপরের দিকে উঠে আসার সুযোগ সীমিত ছিল। আজকের পরিস্থিতির জন্য এটি একটি বড় শিক্ষা। যোগ্য ব্যক্তিদের মূল্যায়ন না করলে বা মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতি না দিলে প্রতিষ্ঠান কীভাবে ধুঁকতে থাকে, সরকারি ব্যাংকগুলো তার জ্বলন্ত উদাহরণ। এখন পরিস্থিতি সামাল দিতে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার, যা গতানুগতিক ধারার বাইরে এক ধরনের বাধ্যবাধকতা।
ভবিষ্যৎ করণীয় ও প্রত্যাশা:
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে অকার্যকর অবস্থা থেকে বের করে আনতে হলে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া এখন জরুরি। প্রথমত, প্রতিটি ব্যাংকে অবিলম্বে যোগ্য, পেশাদার ও রাজনৈতিক পরিচয়মুক্ত পর্ষদ গঠন করতে হবে। নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব রাখা চলবে না। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে বাণিজ্যিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে কেবল আইনি জটিলতা নয়, বরং একটি কার্যকর পুনরুদ্ধার সেল গঠন করা জরুরি। তৃতীয়ত, সরকারি ও বেসরকারি খাতের ঋণের মান যাচাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। এমডি বা চেয়ারম্যানের মেয়াদের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে, যাতে তারা নির্ভয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। চতুর্থত, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অপ্রয়োজনীয় বা লোকসানি ব্যাংকগুলো একীভূত করা বা বন্ধ করার মতো সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
পরিশেষে, দেশ ও অর্থনীতির স্বার্থে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে অচল করে রাখার কোনো সুযোগ নেই। গত ছয় মাসের স্থবিরতা আমাদের একটি বড় সতর্কবার্তা দিচ্ছে। রাজনৈতিক বদল আসলেও প্রতিষ্ঠানিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। সরকার দ্রুত তার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটাবে এবং ব্যাংক খাতকে লুণ্ঠন ও দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করবে—এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো যদি তাদের হারানো গৌরব ফিরে পায়, তবেই দেশের অর্থনীতি সত্যিকার অর্থে একটি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে। সময়ের কাজ সময়ে করাই এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
পাঠকের মন্তব্য