
ইবি রিপোর্ট
পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে নতুন আইপিও অনুমোদনের যে ধীরগতি রয়েছে, তা কাটাতে সময়সীমা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন প্রক্রিয়ায় আইপিও আবেদনের পর তিন মাসের মধ্যে অনুমোদন দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কমিশন।
রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে এ তথ্য জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান। বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিএসইসি।
মাসুদ খান বলেন, আইপিও অনুমোদনে বর্তমানে যে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়, নতুন প্রক্রিয়ায় তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হবে। তার ভাষায়, তিন মাসের মধ্যে আইপিও অনুমোদন দেওয়া হবে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর আইপিও প্রক্রিয়ার জটিলতাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন আইপিও বিধিমালায় আবেদনের পরবর্তী ধাপগুলো দ্রুত শেষ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) এবং কমিশনের সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াগুলো সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা হবে। এর মাধ্যমে অনুমোদনের সময় কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
মাসুদ খান বলেন, পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানি আনার ক্ষেত্রে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ রাখা হচ্ছে। তবে এ ব্যবস্থায় যোগ্যতার মানদণ্ড কঠোর করা হয়েছে। কেবল এলিট বা অত্যন্ত যোগ্য কোম্পানিগুলো সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ পাবে।
বহুজাতিক ও বড় স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনতে সরাসরি তালিকাভুক্তির পাশাপাশি নতুন হাইব্রিড পদ্ধতির সুযোগ দেওয়ার কথাও জানান তিনি। এ ব্যবস্থায় একটি অংশ জনগণের কাছে শেয়ার ছাড়বে এবং অন্য অংশ বিদ্যমান মালিকদের শেয়ার অফলোডের মাধ্যমে বাজারে আসতে পারবে।
পুঁজিবাজার সংস্কারের প্রসঙ্গে বিএসইসি চেয়ারম্যান কমিশনের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিকের অন্যতম পদক্ষেপ ছিল ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়া। ২০২৩ সালে ফ্লোর প্রাইস চালুর পর আন্তর্জাতিক সূচক প্রদানকারী এমএসসিআইয়ের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। একইসঙ্গে বেক্সিমকো-সংক্রান্ত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন। বোর্ড পুনর্গঠনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও সুরক্ষা বাড়াতে পুঁজিবাজারে ডিজিটাইজেশনের ওপরও জোর দেন তিনি। ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারকে সমন্বিত ব্যবস্থায় এনে রিয়েল টাইমে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা নির্দিষ্ট সময়ে ব্রোকারদের হিসাব ও ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থের তথ্য দেখতে পারবে।
অর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু এবং ফিজিক্যাল স্লিপের পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানান তিনি। তার ভাষায়, পুঁজিবাজারে ডিজিটাইজেশন এখন নতুন কারেন্সি।
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ ও মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সিকিউরিটিজ আইন ও সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় সংশোধনী চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানান মাসুদ খান। এর মাধ্যমে কমিশন নিজস্ব সময়ের মধ্যে সরাসরি মামলা করার সুযোগ পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন নিয়েও বক্তব্য দেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বন্ড অনুমোদন করা হয়েছে। তবে বন্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত হওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বন্ড মার্কেটের উন্নয়নে স্টক মার্কেটের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ প্রয়োজন। গ্রিন বন্ডসহ বিভিন্ন ধরনের বন্ডের বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। পেনশন ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ফান্ড ও বীমা কোম্পানির অর্থের একটি অংশ যাতে করপোরেট বন্ড ও শেয়ারে বিনিয়োগ করা যায়, সে বিষয়ে ভবিষ্যতে নীতিগত উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
বীমা খাতকে পুঁজিবাজারের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উল্লেখ করে এ খাতকে আরও সক্রিয় করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি মিউচুয়াল ফান্ড খাতের উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান।
দেশের পুঁজিবাজারের আকার প্রসঙ্গে মাসুদ খান বলেন, অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বাজার মূলধন এখনও কম। তবে বাজার মূলধন বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই লেনদেনের পরিমাণও বাড়বে।
দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের অংশ হিসেবে ডেরিভেটিভস মার্কেট, ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোর কার্যকারিতা এবং ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়েও কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহের কার্যক্রম এক সপ্তাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না বিএসইসি। বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বাড়ানো, বাজারের আস্থা পুনর্গঠন এবং পুঁজিবাজারের কাঠামোগত উন্নয়নের কাজ অব্যাহত রাখার কথা জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন।