
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রায় ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়াকে স্বাগত জানালেও বর্তমান সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, সরকার মুখে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বললেও বাস্তবে আগের সাংবিধানিক কাঠামোর ধারাবাহিকতাই অনুসরণ করছে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত সংস্কার কার্যকর করা সম্ভব হতো। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতিতেও যেসব সংস্কারে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল, সেগুলো এবার বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে গোপন ব্যালটে ভোট দেওয়ার বিষয়টিও ছিল।
তবে সেই সংস্কার কার্যকর না করেই বর্তমান সরকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজন করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর মতে, এর ফলে রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিয়ে জনগণের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনকে স্বাগত
নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রায় ৩৫ বছর পর সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হচ্ছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপতি পদে একক প্রার্থী থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।
এবার সরকারি দল ও বিরোধী দল—দুই পক্ষেরই প্রার্থী থাকায় ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, তাঁদের প্রত্যাশা ছিল গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত সংস্কার কার্যকর হবে। সেটি না হলেও তাঁরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, সরকারি দল যেন একতরফাভাবে নিজেদের প্রার্থীকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করতে না পারে, সে জন্য বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে জনগণের কাছে একটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়াই তাঁদের উদ্দেশ্য।
সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়া সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন নাহিদ ইসলাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে এবং সংসদ সদস্যরা নিজেদের বিবেক অনুযায়ী ভোট দেবেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে জাতীয় সংসদ কক্ষে যে বৈঠক হচ্ছে, সেটি সংসদের সাধারণ অধিবেশন নয়। এ বৈঠকে স্পিকার সভাপতিত্ব করছেন না; প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সভাপতিত্বে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাই তাঁর মতে, এই নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।
৭০ অনুচ্ছেদ নিয়েও প্রশ্ন
সংসদ সদস্যদের ভোটের স্বাধীনতার প্রসঙ্গে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়টি তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, এই অনুচ্ছেদ নিয়ে এর আগেও আলোচনা হয়েছে এবং এর সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল।
তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা যাতে স্বাধীনভাবে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেটিই তাঁদের প্রত্যাশা।
বর্তমান সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।
সরকারের বিরুদ্ধে জুলাই সনদ নিয়ে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ
সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচনের পর থেকেই সরকার অক্ষরে অক্ষরে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলে আসছে। কিন্তু বাস্তবে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে আগের সাংবিধানিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতাই দেখা যাচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও এর ব্যতিক্রম নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলামের দাবি, কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক সাংবিধানিক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো গড়ে তোলার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেই পুরোনো কাঠামোর মধ্যেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকার মুখে জুলাই সনদ, গণভোট ও সংস্কারের কথা বললেও বাস্তবে পুরোনো সাংবিধানিক কাঠামো ধরে রাখছে। দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং অন্যান্য প্রস্তাবিত সংস্কার কার্যকর করারও দাবি জানান তিনি।
জনগণের কাছে রাজনৈতিক বার্তা দিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ
নাহিদ ইসলাম বলেন, এনসিপি গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং প্রতিযোগিতামূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁরা জনগণের কাছে সেই রাজনৈতিক বার্তাই পৌঁছে দিতে চেয়েছেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়া সংসদ সদস্যরা নিজেদের ভোটাধিকার স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করবেন এবং নির্বাচন একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হবে।
সব মিলিয়ে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একদিকে দীর্ঘ বিরতির পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোটের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে জুলাই সনদ, সাংবিধানিক সংস্কার ও সংসদ সদস্যদের ভোটের স্বাধীনতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও নতুন করে সামনে এসেছে। নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে এসব সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য