
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হোটেলটির লিজ-হোল্ডার আবু জাফরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বুধবার (১৯ আগস্ট) গভীর রাতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়ার পর গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এন্টালি থানা এলাকার মেন মার্কেট থেকে আবু জাফরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বাড়ি কলকাতার জোড়াসাঁকো এলাকায়। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই হোটেলটির পরিচালনা ব্যবস্থা, লিজ-সংক্রান্ত নথি এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখছিল তদন্তকারী দল। এসব তদন্তের সূত্র ধরেই আবু জাফরের ভূমিকা সামনে আসে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আরও দুজন হোটেলকর্মীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে একজন পাশের ‘যাপন’ হোটেলের ম্যানেজার এবং অন্যজন ওই হোটেলের কর্মী। ‘যাপন’ হোটেলটিরও লিজ-হোল্ডার আবু জাফর।
আগুনে প্রাণ যায় ৯ জনের
বুধবার ভোরে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ছয় পুরুষ, দুই নারী ও এক শিশুসহ মোট নয়জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশের নাগরিক এবং দুজন ভারতের নাগরিক।
নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে একই পরিবারের চারজন রয়েছেন। তারা হলেন কুষ্টিয়ার দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শারমীন, তাদের তিন বছরের ছেলে স্বর্ণশীষ দত্ত এবং দেবাশীষের শ্বশুর মো. আকরাম আলি।
এ ছাড়া নিহত অন্য বাংলাদেশিরা হলেন ঢাকার সাভারের বাবু আহমেদ এবং সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের রেবতী সরকার ও এস এম আলিমুজ্জামান।
নিহত দুই ভারতীয় নাগরিক হলেন ঝাড়খণ্ডের সন্দীপ পাশওয়ান এবং শিলিগুড়ির যোগী নারায়ণ।
সংকীর্ণ প্রবেশপথে বাড়ে বিপদ
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এসি বিস্ফোরণ বা শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। পাঁচতলা ভবনের আবাসিক হোটেলটির তৃতীয় তলায় প্রথমে আগুন লাগে। পরে দ্রুত কালো ধোঁয়া পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। এরই মধ্যে তৃতীয় তলার বেশ কয়েকটি কক্ষ আগুনে পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হোটেলের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ সংকীর্ণ হওয়ায় আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে অনেকেই ভেতরে আটকা পড়েন।
ঘটনার সময় তৃতীয় তলার অনেক আবাসিক ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। ফলে তারা দ্রুত বের হতে পারেননি। অন্যদিকে হোটেলের অন্যান্য তলার পর্যটকদের অনেকে ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট অনুভব করে জেগে ওঠেন। কেউ ছাদে উঠে যান, আবার কেউ নিচে নেমে রাস্তায় চলে আসেন।
খবর পেয়ে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে থাকা ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তর থেকে একাধিক গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। পরে নিউমার্কেট, পার্ক স্ট্রিট ও তালতলা থানার পুলিশ সদস্যরাও উদ্ধারকাজে যোগ দেন।
উদ্ধার করা হয় ৬০ থেকে ৭০ জনকে
আগুন হোটেলের অন্তত চারটি কক্ষে ছড়িয়ে পড়েছিল। আগুনের পাশাপাশি ঘন কালো ধোঁয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের সদস্যরা অভিযান চালিয়ে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জনকে উদ্ধার করেন। তাদের মধ্যে আহত ও অসুস্থ ব্যক্তিদের কলকাতা মেডিকেল কলেজ, নীল রতন সরকারসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।
তদন্তে বিশেষ দল, মামলা দায়ের
অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং হোটেলটির নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করা হয়েছে। তদন্তকারী দলের নেতৃত্বে রয়েছেন কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট)।
তদন্তকারীরা আগুনের সূত্রপাতের কারণ, ভবনের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, হোটেলের পরিচালনা ও লিজ-সংক্রান্ত বিষয়সহ বিভিন্ন দিক পরীক্ষা করছেন।
এ ঘটনায় নিউমার্কেট থানায় স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। অনিচ্ছাকৃত হত্যার ধারা, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং সমবেতভাবে অপরাধের ধারায় মামলাটি করা হয়েছে। পাশাপাশি দমকল বিভাগের পক্ষ থেকেও পৃথক একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডে নয়জনের মৃত্যুর ঘটনায় ইতোমধ্যে হোটেলটির লিজ-হোল্ডার আবু জাফরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হোটেলের নিরাপত্তাব্যবস্থা, পরিচালনা এবং অগ্নিকাণ্ডের পেছনে কোনো ধরনের অবহেলা বা অনিয়ম ছিল কি না, তা আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাঠকের মন্তব্য