
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি অলি আহমদ।
সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো ব্যবস্থা নয়। এর সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হয় ১৯৯১ সালে। দীর্ঘ সামরিক ও রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার পর ওই বছর বাংলাদেশ আবার সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যায়। এর ফলে রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা কমে তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান কার্যকর হয়।
তবে ১৯৯১ সালের এই পরিবর্তনের পেছনে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন, নির্বাচন-পরবর্তী ক্ষমতার সমীকরণ, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান এবং শেষ পর্যন্ত বিএনপির অবস্থান পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
এরশাদের পতনের পর রাজনৈতিক সমঝোতা
১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৯০ সালের শেষ দিকে সেই আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করলে বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন। তাঁর সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে সামরিক শাসনের অবসান এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে ন্যূনতম ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল। সেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
তবে নির্বাচনের আগে ভবিষ্যৎ সরকারব্যবস্থা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থান ছিল ভিন্ন।
নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থান
আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যেই সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি অব্যাহত রাখার পক্ষে ছিল।
অর্থাৎ ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সামনে সরকারব্যবস্থা নিয়ে দুটি ভিন্ন ধারণা ছিল। আওয়ামী লীগ সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল, আর বিএনপি রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।
কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল পুরো রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে দেয়।
নির্বাচনের ফল বদলে দিল রাজনৈতিক হিসাব
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ সাধারণ আসনের মধ্যে ১৪০টি আসন পায়। আওয়ামী লীগ পায় ৮৮টি, জাতীয় পার্টি ৩৫টি এবং জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসন।
পরে সংরক্ষিত নারী আসন যুক্ত হলে বিএনপির মোট আসন দাঁড়ায় ১৬৮। ৩৩০ সদস্যের সংসদে বিএনপি সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয় এবং সরকার গঠন করে। ২০ মার্চ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
এখানেই রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি নিয়ে বিএনপির আগের অবস্থানের সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সংঘাত তৈরি হয়।
রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা বহাল থাকলে নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র থাকত রাষ্ট্রপতির পদে। অন্যদিকে সংসদীয় ব্যবস্থা চালু হলে নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র হতো প্রধানমন্ত্রী ও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল।
ফলে নির্বাচনের পর বিএনপির হাতে থাকা সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংসদীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে আরও সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
বিএনপির ভেতরেও বদলাতে থাকে মত
শুধু বিরোধী দলের রাজনৈতিক চাপের কারণেই বিএনপির অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছিল—বিষয়টি এতটা সরল ছিল না। নির্বাচনের পর বিএনপির ভেতরেও সরকারব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
একদিকে আওয়ামী লীগ সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে থাকে। অন্যদিকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তৈরি হওয়া গণতান্ত্রিক ঐকমত্যও নতুন করে সামনে আসে।
বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে সংসদীয় ও রাষ্ট্রপতি—দুই ধরনের ব্যবস্থার পক্ষেই মত পাওয়া যায়। এমনকি মিশ্র কাঠামোর পক্ষেও মত ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে বিএনপির নেতৃত্ব ও সংসদীয় দলের মধ্যে সংসদীয় ব্যবস্থার পক্ষে সমর্থন জোরালো হতে থাকে।
২ জুলাই বিএনপিই আনল পরিবর্তনের বিল
শেষ পর্যন্ত ১৯৯১ সালের ২ জুলাই প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাতীয় সংসদে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী বিল উত্থাপন করেন। এই বিলের মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে আবার সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া।
আওয়ামী লীগও পৃথক একটি সাংবিধানিক সংশোধনী প্রস্তাব দেয়। দুই দলের প্রস্তাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি, সংসদ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা এবং মন্ত্রিসভায় সংসদ সদস্য নন—এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তিসহ কয়েকটি বিষয়ে পার্থক্য ছিল।
এসব মতপার্থক্য দূর করতে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে ১৫ সদস্যের একটি সিলেক্ট কমিটি গঠন করা হয়। আলোচনা শেষে কমিটি ঐকমত্যে পৌঁছায়।
এরপর ৬ আগস্ট সংশোধনী বিলটি সংসদে অনুমোদনের জন্য তোলা হয়।
৩০৭-০ ভোটে ফিরে আসে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা
১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট জাতীয় সংসদে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী বিল ৩০৭-০ ভোটে পাস হয়। পরে বিষয়টি গণভোটে যায়।
দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চলে যায়। প্রধানমন্ত্রী হন সরকারের নির্বাহী প্রধান এবং মন্ত্রিসভা সংসদের কাছে দায়বদ্ধ হয়। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
একই সঙ্গে উপরাষ্ট্রপতির পদ বিলুপ্ত করা হয় এবং সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান কার্যকর হয়।
অর্থাৎ ১৯৯১ সালের সাংবিধানিক পরিবর্তন শুধু সরকারব্যবস্থার ধরন বদলায়নি; এর মাধ্যমেই সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বর্তমান ব্যবস্থার সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হয়।
গণভোটে ৮৪ শতাংশ ‘হ্যাঁ’
সংসদে পাস হওয়ার পর ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯১ দ্বাদশ সংশোধনী নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
সরকারি ফল অনুযায়ী, ১ কোটি ৮৩ লাখের বেশি ভোট সংশোধনীর পক্ষে এবং প্রায় ৩৪ লাখ ভোট বিপক্ষে পড়ে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের হার ছিল প্রায় ৮৪ শতাংশ। ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৩৫ শতাংশ।
এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে আবার সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যায়।
সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরলেও রাষ্ট্রপতির পদ থাকল
সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরে আসার অর্থ রাষ্ট্রপতির পদ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নয়। বরং রাষ্ট্রপতির ভূমিকা পরিবর্তিত হয়।
রাষ্ট্রপতি আর সরকারের নির্বাহী প্রধান থাকেননি। তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নতুন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দায়িত্বও সংসদের হাতে চলে যায়।
দ্বাদশ সংশোধনীর পর ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর জাতীয় সংসদে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
ওই নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। আওয়ামী লীগ প্রার্থী করেছিল সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে।
৩৩০ সদস্যের সংসদে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পান। বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট। ৬৬ জন সদস্য ভোট দেননি। ১০ অক্টোবর আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এটি ছিল সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের প্রথম পরোক্ষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
তাহলে বিএনপি কেন অবস্থান বদলেছিল?
১৯৯১ সালের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে বিএনপির অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে।
প্রথমত, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ১৬৮ আসন নিয়ে সংসদে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। সংসদীয় ব্যবস্থা চালু হলে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার মাধ্যমে বিএনপির রাজনৈতিক ক্ষমতা আরও সরাসরি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তৃতীয়ত, আওয়ামী লীগ নির্বাচনের পর সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে সক্রিয় রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।
চতুর্থত, বিএনপির নিজস্ব সংসদীয় দল ও নেতৃত্বের মধ্যেও ধীরে ধীরে সংসদীয় সরকারব্যবস্থার পক্ষে সমর্থন বাড়তে থাকে।
সব মিলিয়ে ১৯৯১ সালের সরকারব্যবস্থার পরিবর্তনকে শুধু একটি দলের অবস্থান পরিবর্তন হিসেবে দেখলে পুরো ঘটনাটি বোঝা যায় না। এর পেছনে ছিল এরশাদবিরোধী গণআন্দোলন, জাতীয় নির্বাচন, নির্বাচনের ফলাফল, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাব।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বৃহস্পতিবার আবারও সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেই ১৯৯১ সালের সাংবিধানিক পরিবর্তনের ইতিহাসকে নতুন করে সামনে এনেছে। এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা রয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য