![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণকে নিজেদের পকেট থেকে যে ব্যয় বহন করতে হয়, তা আফগানিস্তানের তুলনায়ও বেশি বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, এই আর্থিক চাপ কমাতে সরকার ধাপে ধাপে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বুধবার রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে আয়োজিত বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ‘ডিবেটিং বাজেট অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষকে স্বাস্থ্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হয়, যা অনেক পরিবারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক বোঝা তৈরি করছে। শুধু স্বাস্থ্য নয়, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক সেবার ক্ষেত্রেও একই ধরনের চাপ রয়েছে।
তিনি জানান, সরকার প্রাথমিকভাবে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে মানুষের সঞ্চয় বৃদ্ধি পাবে, স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারবে।
বাজেটকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার চেষ্টা
সেমিনারে আমির খসরু বলেন, বাজেট কেবল একটি বার্ষিক আর্থিক দলিল নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব এবং অর্থায়ন ব্যবস্থাপনার মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার পুরোনো বাজেট কাঠামো থেকে বেরিয়ে নতুন চিন্তা ও নতুন অর্থনৈতিক মডেলের দিকে যেতে চায়। কারণ দেশের অর্থনীতিতে বৈষম্য এখনও উল্লেখযোগ্য। বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে ক্ষমতাবান ও সংগঠিত গোষ্ঠীর প্রভাব থাকলেও দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চাহিদা অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়।
অর্থমন্ত্রী জানান, এবারের বাজেটকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে দেশের প্রতিটি নাগরিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন এবং উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারেন।
নারীর ক্ষমতায়নে ‘ফ্যামিলি কার্ড’
নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, গ্রামের অসংখ্য গৃহিণী প্রতিদিন পরিবারের জন্য কাজ করলেও তাদের নিজস্ব কোনো আয় থাকে না। এ বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ধারণা চালু করছে।
তার মতে, এই উদ্যোগ নারীদের ব্যয় করার সক্ষমতা বাড়াবে, পরিবারের পুষ্টির মান উন্নত করবে এবং সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও নতুন চাহিদা সৃষ্টি হবে।
কৃষকদের জন্য আরও সহায়তা প্রয়োজন
কৃষিখাত নিয়ে বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, কৃষকদের শুধু ঋণ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের জন্য সার, বীজ এবং অন্যান্য মৌলিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার কৃষিঋণ মওকুফ করতে হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে কৃষকদের জন্য আরও বিস্তৃত ও কার্যকর সহায়তা প্রয়োজন।
এক কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য
সরকার আগামী দিনে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, গ্রামীণ কারুশিল্প, সংস্কৃতি, ক্রীড়া এবং সৃজনশীল অর্থনীতিকেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, কামার, কুমার, কারুশিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, সংগীতশিল্পী এবং খেলোয়াড়দের মতো দীর্ঘদিন মূলধারার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পুঁজিবাজার ও উন্নয়ন প্রকল্পে সংস্কার
পুঁজিবাজারকে দেশের অর্থায়নের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে বলে জানান আমির খসরু। তিনি বলেন, ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন কমিয়ে পুঁজিবাজারকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে পেশাদারদের নিয়ে নতুন কমিশন গঠন করা হয়েছে।
এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গৃহীত প্রায় ১ হাজার ৩০০টি উন্নয়ন প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ প্রকল্প ইতোমধ্যে বাতিল বা পুনর্গঠনের আওতায় এসেছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তথ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের হার ৮০ শতাংশে উন্নীত করা গেলে দেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরও সহজ হবে।
কৃষি এখনও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
বক্তব্যের শেষদিকে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কৃষি এখনও সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত। বাজেটের প্রতিটি বিষয় সরাসরি দৃশ্যমান না হলেও বাস্তবায়ন পর্যায়ে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করেই সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে