
ইবি রিপোর্ট
এক মাসের ব্যবধানে আমদানি প্রায় ২৫ শতাংশ কমে যাওয়ায় দেশের বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। সরবরাহ ঘাটতির সুযোগে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের তুলনায় সিলিন্ডারপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। ফলে খুচরা বাজারে রান্নার কাজে বহুল ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম দুই হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
বিইআরসি ও এলপিজি আমদানিকারক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে দেশে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল। তবে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে আমদানির পরিমাণ কমে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এলপিজি আমদানি কমেছে প্রায় ৪০ হাজার টন।
এর মধ্যেই চলতি মাসের ২ সেপ্টেম্বর বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করে। কিন্তু নির্ধারিত দামে পণ্য না পেয়ে ভোক্তাদের বাজারে একটি সিলিন্ডারের জন্য গুনতে হচ্ছে প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থার প্রভাব পড়েছে এলপিজির আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায়। লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অচলাবস্থা ও নিরাপত্তাজনিত জটিলতা তৈরি হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জাহাজসংকট দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে পণ্য পরিবহনের খরচ।
বাংলাদেশের এলপিজির প্রধান আমদানি উৎস মধ্যপ্রাচ্য। ফলে ওই অঞ্চলের নৌপথগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় বিকল্প পথে এলপিজি আমদানি করতে হচ্ছে। এতে পণ্য দেশে আনতে আগের তুলনায় বেশি সময় ও ব্যয় হচ্ছে।
মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি লিমিটেডের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা (সিএমও) আবু সাঈদ রেজা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কার্গো পাওয়া। আগে একটি নৌপথ বন্ধ থাকলে অন্য একটি পথ দিয়ে পণ্য আনার সুযোগ থাকত। এখন সেই বিকল্প ব্যবস্থাও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
তিনি জানান, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও অনেক বৈশ্বিক সরবরাহকারী সরবরাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। এমনকি বাড়তি প্রিমিয়াম দেওয়ার পরও খোলাবাজার থেকে প্রয়োজনীয় কার্গো সংগ্রহ করা যাচ্ছে না।
আমদানিকারকদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজি কার্গোর বাড়তি প্রিমিয়াম এবং পরিবহন ব্যয়ের চাপ বিইআরসির মাসিক মূল্য নির্ধারণের সূত্রে পুরোপুরি সমন্বয় করা হচ্ছে না।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে কার্গো প্রিমিয়াম টনপ্রতি ১৬০ ডলার থেকে বেড়ে বর্তমানে ২৬০ থেকে ৪০০ ডলারে পৌঁছেছে।
আমদানিকারকদের ভাষ্য, এই বাড়তি খরচ বিবেচনায় না নিয়ে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি করলে লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসান এড়াতে আমদানির পরিমাণ সীমিত রেখেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারে সরবরাহের ওপর।
ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানজীম চৌধুরী জানান, সেপ্টেম্বর মাসে তাদের প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে। বৈশ্বিক সংকটের কারণে উৎপাদক পর্যায়েও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির রান্নার কাজে। আর দেশের মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৯৯ শতাংশই সরবরাহ করে বেসরকারি খাত।
ফলে বেসরকারি আমদানিকারকদের সরবরাহে কোনো ধরনের বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। বিশেষ করে গ্যাসলাইন সুবিধার বাইরে থাকা পরিবারগুলো রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সংকটের সময় তাদের বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, কিছু প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত জাহাজ সময়মতো দেশে পৌঁছাতে না পারায় সেপ্টেম্বর মাসে বাজারে এলপিজির ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, সংকট কাটাতে দ্রুত আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করা হবে। সরবরাহ স্বাভাবিক করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
তবে বৈশ্বিক নৌপথের জটিলতা দ্রুত দূর না হলে এবং প্রয়োজনীয় কার্গো নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে অক্টোবর মাসেও এলপিজির সংকট অব্যাহত থাকার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিইআরসি চেয়ারম্যান।
ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, নৌপথের নিরাপত্তা এবং পর্যাপ্ত কার্গো আমদানি—এই তিনটি বিষয়ের ওপরই এখন দেশের এলপিজি সরবরাহ ও বাজারদরের স্থিতিশীলতা অনেকটাই নির্ভর করছে।
পাঠকের মন্তব্য