![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
নাগরিকত্বের জটিলতা, সীমান্ত রাজনীতি এবং মানবিক সংকটের নির্মম বাস্তবতার মধ্যে পড়ে চার দিন ধরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে আটকে থাকা ৯ জন মানুষ। তাদের মধ্যে রয়েছে মাত্র ৬ মাস বয়সী একটি শিশু, আড়াই বছর বয়সী আরেকটি শিশু, এক নারী এবং কয়েকজন যুবক। খোলা আকাশের নিচে, সীমান্তের শূন্যরেখায় অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দিন কাটছে তাদের।
স্থানীয়দের মতে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কথিত পুশইন চেষ্টার পর থেকেই তারা সীমান্তের নো-ম্যানস-ল্যান্ডে অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছেন। মানবাধিকার, সীমান্ত সংকট এবং শিশু সুরক্ষার প্রশ্নে ঘটনাটি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন জামালপুর ৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান। তিনি জানান, বিষয়টির সমাধানে বিজিবি একাধিকবার উদ্যোগ নিলেও বিএসএফের পক্ষ থেকে কার্যকর সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে মানবিক দিক বিবেচনায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখায় দুই শিশু, এক নারী ও তিন পুরুষ অবস্থান করছেন। একইভাবে ভন্দুরচর সীমান্তে আরও তিন যুবক খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন। একটি পাতলা প্লাস্টিকের ছাউনি ছাড়া তাদের মাথা গোঁজার আর কোনো ব্যবস্থা নেই।
প্রচণ্ড গরম, মাঝেমধ্যে বৃষ্টি এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে দুই শিশু। বিশেষ করে ৬ মাস বয়সী শিশুটির স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। সেখানে নেই পর্যাপ্ত খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল, চিকিৎসা সুবিধা কিংবা প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন ব্যবস্থা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত রোববার সকালে গয়টাপাড়া ও ভন্দুরচর সীমান্ত দিয়ে কয়েকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। বিষয়টি টের পেয়ে বিজিবি এবং স্থানীয়রা বাধা দিলে তারা সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান নিতে বাধ্য হন। এরপর থেকেই তারা কার্যত দুই দেশের মাঝখানে আটকে রয়েছেন।
মানবিক সংকটের বিষয়টি স্থানীয় জনগণের মধ্যেও গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গয়টাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা লিটন মিয়া বলেন, “শিশু দুটির কোনো দোষ নেই। বিশেষ করে ৬ মাস বয়সী শিশুটি তো কোনো কিছুই বোঝে না। তবুও তাকে রোদ-বৃষ্টি সহ্য করতে হচ্ছে। এটি অত্যন্ত অমানবিক। দ্রুত সমাধান হওয়া উচিত।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তে আটকে থাকা এসব মানুষ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতার শিকার হয়েছেন। তাদের মতে, নাগরিকত্ব যাচাই কিংবা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন থাকলেও শিশু ও নারীদের এমন পরিস্থিতিতে ফেলে রাখা কোনোভাবেই মানবিক নয়।
এদিকে বিজিবি জানিয়েছে, বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য আবারও বিএসএফকে পতাকা বৈঠকের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক সাড়া পাওয়া যায়নি।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, সীমান্তে আটকে থাকা শিশু, নারী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দুই দেশেরই দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো মানুষকে খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয় ছাড়া দীর্ঘ সময় সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে রাখা গুরুতর মানবিক উদ্বেগের বিষয়।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত এই সংকটের সমাধান হবে। সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে থাকা মানুষগুলো আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন—এমন আশাই করছেন সবাই।
পাঠকের মন্তব্য