![]()
১৩ বছর আগে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চীন থেকে ২০ সেট ডেমু ট্রেন কিনেছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু যান্ত্রিক ও প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে সাত বছর না যেতেই সেগুলো পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। এবার সেই পড়ে থাকা ডেমু ট্রেনগুলো সচল করার নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার।
প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে দুটি ট্রেন সচল করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ সফল হলে পর্যায়ক্রমে সব কটি ডেমু ট্রেন সচল করা হবে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে রেলকে জাতীয় পরিবহনের কেন্দ্রীয় মেরুদণ্ড হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করার অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে চীন থেকে কেনা ২০ সেট ডেমু ট্রেনের প্রতি সেটে দুই দিকে দুটি ইঞ্জিন এবং মাঝখানে একটি কোচ রয়েছে। চালুর তিন বছর পর থেকেই ট্রেনগুলো অকেজো হতে শুরু করে। এগুলো দিয়ে যাত্রী পরিবহন থেকে যে সামান্য আয় হতো, তার চেয়ে বেশি খরচ হতো জ্বালানি তেল ও রক্ষণাবেক্ষণে। পরে নানা উদ্যোগ নিয়েও এগুলো সচল রাখা যায়নি। বর্তমানে সব কটি ডেমু ট্রেনই অচল অবস্থায় বিভিন্ন স্টেশনে পড়ে আছে।
সরকারের নতুন পরিকল্পনা
গত ১ এপ্রিল ঢাকায় রেল ভবনে একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম নতুন সরকারের অগ্রাধিকার বিষয়ে আলোচনা করেন।
তিনি জানান, অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে রেলকে জাতীয় পরিবহনের কেন্দ্রীয় মেরুদণ্ড হিসেবে গড়ে তুলতে রেলপথ মন্ত্রণালয় ছয় মাস, এক বছর ও পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে।
এই কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবেই চলতি বছরের মার্চ থেকে জুনের মধ্যে রেলওয়ের অকেজো ও অব্যবহৃত ডেমু ট্রেনগুলোকে ব্যবহারের উপযোগী কমিউটার ট্রেনে রূপান্তর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ জন্য পরীক্ষামূলক প্রকল্পে আগ্রহী প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠান নির্বাচন শেষে পরের দুই মাসে তাদের কাছে অকেজো ডেমু ট্রেন হস্তান্তর করা হবে। ডেমু ট্রেনগুলো সচল হলে স্বল্প দূরত্বে বেশি যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে। এই কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রেলওয়ের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত মহাপরিচালককে।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ফকির মো. মহিউদ্দীন বলেন, একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে এবং এটি নিয়ে কাজ চলছে। অচল ডেমুগুলো মেরামতে দুটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছে, যা বর্তমানে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
যান্ত্রিক ও প্রযুক্তিগত ত্রুটি
রেলওয়ের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগের তথ্যমতে, চীনের তানশাং ইন্টারন্যাশনাল ও ডানিয়াল টেকনিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট ডেমু ট্রেনগুলো তৈরি করেছিল।
কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত এই ট্রেনগুলো বিশেষ ধরনের সফটওয়্যার দিয়ে পরিচালিত হতো। কিন্তু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কখনো বাংলাদেশকে সেই প্রযুক্তি হস্তান্তর করেনি। ফলে কোনো মডিউল বিকল হলে নতুন মডিউলের সঙ্গে সফটওয়্যার সেটআপ দেওয়ার প্রয়োজন হতো, যার জন্য চীনা প্রকৌশলীদের প্রয়োজন পড়ত। এটি ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
পার্বতীপুরের সেন্ট্রাল লোকোমোটিভ কারখানার তথ্যমতে, প্রতিটি ডেমুতে ৪০টি মডিউল রয়েছে, যার প্রতিটির দাম প্রায় ৭ লাখ টাকা। চীনা প্রকৌশলীরা প্রযুক্তি হস্তান্তর না করায় একের পর এক ট্রেন বিকল হতে থাকে। যান্ত্রিক ও প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে তিন থেকে সাত বছরের মধ্যে সবগুলো ট্রেন অকার্যকর হয়ে পড়ে। অথচ প্রতিটি ডেমু ট্রেনের পরিচালনকাল ধরা হয়েছিল ৩৫ বছর।
পরে ২০১৮ সালে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নিষ্ক্রিয় ডেমু ট্রেনগুলো মেরামতের জন্য সরবরাহকারী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু তারা মেরামতের জন্য যে অর্থ দাবি করে, তা ট্রেনগুলোর আমদানি ব্যয়ের প্রায় সমান ছিল।
ডেমু ট্রেনের সীমাবদ্ধতা
অধিক যাত্রী বহনের উদ্দেশ্যে ডেমু ট্রেন আমদানি করা হলেও বাস্তবে এর অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। প্রতিটি কোচে ৩০০ যাত্রীর ধারণক্ষমতা থাকলেও ট্রেনটি সেই চাপ নিতে পারত না। বিকল হয়ে যাওয়ার ভয়ে ট্রেনগুলোকে মূলত যাত্রী কম থাকে এমন সময় চালানো হতো।
ডেমু পরিচালনার প্রধান সমস্যার মধ্যে ছিল—চাহিদার তুলনায় যাত্রী ধারণক্ষমতা কম হওয়া, পর্যাপ্ত বাতাস প্রবেশের সুযোগ না থাকা এবং যাত্রীদের আসনের নিচে ইঞ্জিন থাকায় মেঝে গরম হয়ে যাওয়া। পরে চীন থেকে প্রকৌশলী এনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পরিবর্তে ফ্যান লাগানো হয় এবং জানালা খোলা রাখার ব্যবস্থা করা হয়।
এছাড়া, এর দরজার হাতলও যাত্রীবান্ধব ছিল না। সাধারণ ট্রেনের চেয়ে দরজার উচ্চতা আধা ফুট বেশি হওয়ায় নারী, শিশু ও বয়স্কদের উঠতে সমস্যা হতো। ডেমুতে কোনো শৌচাগারও ছিল না।
২০২০-২১ সালে রেলওয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের উদ্যোগে প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামানকে দিয়ে পার্বতীপুর কর্মশালায় এক সেট ডেমু ট্রেন মেরামত করা হয়। ২০২২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম ট্রেনটির পরীক্ষামূলক চলাচল উদ্বোধন করেছিলেন। কিন্তু মাত্র ১৫ দিনের মাথায় ওই ডেমু ট্রেনের দুটি ইঞ্জিনের একটি বিকল হয়ে পড়ে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট এক পরিচালক বলেন, ডেমু ট্রেনে অনেক ত্রুটি রয়েছে। এর আগেও একবার মেরামত করে ১৫ দিনের বেশি চালানো যায়নি। এখন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব ছাড়া এটি মেরামত সম্ভব নয়। রেলওয়ে এর পেছনে আর অর্থ ব্যয় করবে না।
রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, বিভিন্ন ত্রুটিসহ ট্রেনটির সবকিছু মাথায় রেখেই আলোচনা চলছে। বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলে জানানো হবে।
পাঠকের মন্তব্য