![]()
ঈদের আগে সাধারণত ঢাকার ব্যস্ততা কিছুটা কমে আসে। অনেকেই তখন নাড়ির টানে ছুটে যান গ্রামের বাড়িতে, কেউ ব্যস্ত থাকেন শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায়, আবার কেউ যান কোরবানির পশুর হাটে। কিন্তু এবার সেই চেনা চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। টানা দুই দিনের ভারি বর্ষণে রাজধানীজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা, যা ঈদের আনন্দের মাঝেও নগরবাসীর ভোগান্তি বাড়িয়ে দিয়েছে।
সোমবারের পর মঙ্গলবারও মুষলধারে বৃষ্টিতে রাজধানীর অধিকাংশ সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। সকাল পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও বেলা সাড়ে ১১টার পর হঠাৎ কালো মেঘে ঢেকে যায় আকাশ। দুপুর ১২টার দিকে শুরু হওয়া টানা প্রায় ৪০ মিনিটের প্রবল বর্ষণে পুরান ঢাকা, এলিফ্যান্ট রোড, নিউমার্কেট, মিরপুর, কালশী, কারওয়ান বাজার, জিগাতলা, গ্রিনরোড, মালিবাগ ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। শুধু প্রধান সড়ক নয়, অলিগলিতেও হাঁটুসমান পানি জমে যায়। এতে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকে গাড়ি। ঈদের কেনাকাটা, পশুর হাট কিংবা বাড়ি ফেরার তাড়ায় বের হওয়া মানুষ পড়েন চরম দুর্ভোগে।
বিশেষ করে কোরবানির পশুর হাট ও আশপাশের এলাকার পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে নাজুক। বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে যায় পশুর বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনা। কোথাও কাদা, কোথাও দুর্গন্ধযুক্ত নোংরা পানির স্তূপ—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয় অস্বস্তিকর পরিবেশ।
পলাশীর বাসিন্দা আশরাফুল হোসেন বলেন, ঈদের আগে ঢাকা অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেছে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে মহল্লার ছোট ছোট রাস্তায়ও জ্যাম তৈরি হচ্ছে। হাটের আশপাশেও জটলা বাড়ছে। এতে ঈদের আমেজটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী রবিউল হাসান বলেন, টানা ভারি বৃষ্টিতে নিউমার্কেট এলাকার প্রায় সব সড়ক ডুবে গেছে। একদিকে ঈদের ছুটি, অন্যদিকে বাড়ি ফেরার তাড়া—সব মিলিয়ে মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব। খাল ও জলাধার দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বর্তমানে পানি সরাতে অনেক এলাকায় পাম্প ব্যবহার করে পানি সেচে নিষ্কাশন করতে হচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, তাদের আওতাধীন এলাকায় বর্তমানে কার্যকর পানি নিষ্কাশন আউটলেট রয়েছে মাত্র তিনটি—কমলাপুর, নারিন্দা ও সোনারগাঁও হোটেল সংলগ্ন এলাকায়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন করে আরও ১০ থেকে ১২টি আউটলেট নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, এসব আউটলেট নির্মিত হলে ভারি বর্ষণের সময় দ্রুত পানি নিষ্কাশন সম্ভব হবে এবং জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।
ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী বোরহান উদ্দিন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন আউটলেট নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে কাজ চলছে। এ জন্য একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা অবশ্য বলছেন, শুধু নতুন আউটলেট নির্মাণ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তাদের মতে, ঢাকার প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ সচল রাখা, খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার এবং টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। অন্যথায় প্রতি বর্ষাতেই রাজধানীবাসীকে একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, কৃত্রিম উপায়ে পানি সরানো সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে ঢাকার প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধার করাই হবে কার্যকর সমাধান।
পাঠকের মন্তব্য