![]()
দেশে সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবাকে জাতীয় প্রতিরোধ কৌশলের কেন্দ্রে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রখ্যাত মহামারি বিশেষজ্ঞ ড. প্রভাত চন্দ্র বড়ুয়া বলেন, “সম্মুখসারির স্বাস্থ্যসেবাই হলো প্রধান রক্ষাকবচ।” তাঁর মতে, টিকাদান, পুষ্টি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক রোগতাত্ত্বিক নজরদারির সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের নেতৃত্বে তৃণমূল পর্যায়ে নজরদারি ও দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবার কল্যাণ কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী শনাক্ত, লক্ষণ পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ ও রিয়েল-টাইম রিপোর্টিংয়ের কাজ করছেন বলেও জানান বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর-এর যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ রোগ শাখার সাবেক লাইন ডিরেক্টর ড. বড়ুয়া বলেন, তথ্য-প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে শিশু রোগ ও নবজাতক বিশেষজ্ঞ ড. বেগম শরীফুন নাহার জানান, কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় এখন তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “আমরা এখন সেই ঘাটতির ফল ভোগ করছি।”
বিশেষজ্ঞরা জানান, মাতৃকালীন অপুষ্টি, কম ওজনের শিশু জন্ম এবং সঠিক শিশুখাদ্য অভ্যাসের অভাব শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করে দিচ্ছে, ফলে হামসহ বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।
সরকার ২০২৬ সালের এপ্রিলে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে দেশব্যাপী জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম শুরু করে। ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং গ্যাভি-র সহায়তায় ৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি ২০ এপ্রিলের মধ্যে সারা দেশে সম্প্রসারিত হয়। ইতোমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার ৯৬ শতাংশের বেশি শিশু টিকা পেয়েছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে দেশের ৫৮টি জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। একজন আক্রান্ত শিশু সর্বোচ্চ ১৮ জন সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসকদের মতে, হামের সাধারণ লক্ষণ হলো উচ্চ জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে লাল ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া। জটিল পরিস্থিতিতে নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস, অন্ধত্ব ও কানের সংক্রমণ হতে পারে। শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গত ৬ মে দেশে ১৫ লাখ ডোজ হাম-রুবেলা (এমআর) এবং ৯ লাখ ডোজ টিটেনাস-ডিপথেরিয়া (টিডি) টিকার নতুন চালান এসেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আশা প্রকাশ করে বলেন, ভবিষ্যতে টিকার কোনো সংকট হবে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৯ মে পর্যন্ত সম্ভাব্য হাম নিয়ে ৩৩ হাজার ৬৩১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ২৯ হাজার ৭৪৬ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। একই সময়ে নিশ্চিত হামে ৬৫ জন এবং সন্দেহভাজন হামে ৩৪৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য