![]()
আহমেদ নাবিল দিপ
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি ও কৃষিনির্ভর মানুষের জীবিকা সুরক্ষায় নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। একই সঙ্গে এল নিনোর কারণে সৃষ্ট জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি জোরদার করতে তিমুর-লেস্তে ও ফিলিপাইনে একটি নতুন অংশীদারত্ব গড়ে তোলা হয়েছে। এ উদ্যোগের আওতায় প্রায় ৪৩ হাজার মানুষকে সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের এক আঞ্চলিক নীতিসংলাপে এসব বিষয় উঠে আসে। এতে বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধি, রাষ্ট্রদূত, উন্নয়ন সহযোগী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল—‘আজ উদ্ভাবন, আগামীতে পুষ্টি’।
প্রসঙ্গত, এল নিনো (El Niño) হলো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত প্রক্রিয়া, যা মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ঘটে। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের পুবালী বায়ু উষ্ণ জলকে এশিয়ার দিকে ঠেলে নিয়ে যায় এবং দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে নিচের ঠান্ডা জল ওপরে উঠে আসে। কিন্তু এল নিনো চলাকালীন এই বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে উষ্ণ জল আর এশিয়ার দিকে না গিয়ে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরেই জমা হতে থাকে এবং সাগরে সঞ্চিত বিপুল পরিমাণ তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে বৈশ্বিক আবহাওয়া এলোমেলো করে দেয়।
উদ্ভাবনের সঙ্গে বিনিয়োগের তাগিদ
এফএওর এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সহকারী মহাপরিচালক ও আঞ্চলিক প্রতিনিধি আলু দোহং বলেন, শুধু উদ্ভাবন দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। নতুন ধারণা ও প্রযুক্তিকে কার্যকর করতে অংশীদারত্ব এবং বিনিয়োগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এমন কৃষি-খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা হবে দক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম ও টেকসই। এর মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্মের খাদ্যচাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক সম্পদও সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।
নীতিসংলাপে কৃষি-খাদ্যব্যবস্থার রূপান্তরের তিনটি ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হয়। এগুলো হলো খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টিতে উদ্ভাবনের ব্যবহার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি ও দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি। আলোচনায় নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী সমাধানকে বৃহত্তর পরিসরে কাজে লাগানোর জন্য সহায়ক নীতি, বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এসব উদ্যোগের সুফল যেন অঞ্চলটির সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়, সে বিষয়েও জোর দেওয়া হয়।
এল নিনোর ক্ষতি কমাতে নতুন অংশীদারত্ব
ব্যাংককের নীতিসংলাপের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হলো এল নিনোর প্রভাব মোকাবিলায় পর্যবেক্ষণ, প্রস্তুতি ও আগাম পদক্ষেপ জোরদার করা। এ উদ্যোগে এফএওর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুইজারল্যান্ড সরকার ও সুইস উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিস ফেডারেশন এবং তিমুর-লেস্তে রেড ক্রস।
উদ্যোগটির লক্ষ্য তিমুর-লেস্তে ও ফিলিপাইনের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে জলবায়ুসংশ্লিষ্ট সম্ভাব্য বিপর্যয়ের আগেই প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। এর মাধ্যমে প্রায় ৪৩ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এফএওর সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোই এ অংশীদারত্বের মূল উদ্দেশ্য। এর ফলে খাদ্যনিরাপত্তা ও মানুষের জীবিকা সুরক্ষায় সহায়তা পাওয়া যাবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ সহযোগিতা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয়।
আঞ্চলিক সহযোগিতায় জোর
কৃষি-খাদ্যব্যবস্থার সমস্যাগুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে নীতিসংলাপে তুলে ধরা হয়। এফএওর উপআঞ্চলিক প্রতিনিধি কেন শিমিজু আলোচনায় উঠে আসা বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেন এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, কৃষি-খাদ্যব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্ন খাত, প্রতিষ্ঠান ও দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। ভবিষ্যতের জন্য সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে অংশীদারত্ব এবং বিপর্যয়ের আগেই প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আন্দালিব ইলিয়াস, মঙ্গোলিয়ার রাষ্ট্রদূত ওইউ ভাশা, নেপালের রাষ্ট্রদূত ধন বাহাদুর ওলি এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত সাদিয়া আলতাফ কাজি অংশ নেন। এ ছাড়া সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ফ্যাব্রিস ফিলিয়েজ, থাইল্যান্ডের কৃষি ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপস্থায়ী সচিব পংথাই থাইয়োতিন এবং বিভিন্ন দেশের সরকারি ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
নীতিসংলাপের সমাপনীতে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা, টেকসই জীবিকা গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি করতে কৃষি-খাদ্যব্যবস্থার রূপান্তরে সম্মিলিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করা হয়।