![]()
আহমেদ তোফায়েল
ব্যাংকে টাকা জমা রাখার উদ্দেশ্য নিরাপত্তা। মানুষ নিজের আয়, সঞ্চয় কিংবা ভবিষ্যতের প্রয়োজন মেটানোর অর্থ ব্যাংকে রাখেন এই বিশ্বাসে যে প্রয়োজনের সময় তা ফেরত পাবেন। কিন্তু কোনো ব্যাংক যখন গ্রাহককে তাঁর জমা টাকা দিতে পারে না, তখন সংকট আর শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা আঘাত করে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের শনিবার ( ১০-১০-২৬) বক্তব্য সেই সংকটের গভীরতাই সামনে এনেছে। তাঁর হিসাবে, ব্যাংক খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর জাতীয় বাজেট থেকে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। গত সপ্তাহে এ বিষয়ে সরকারের কাছে একটি খসড়া প্রস্তাবও পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রশ্ন হলো, ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারের এই বিপুল ব্যয় কীভাবে বহন করা হবে, আর যাঁদের কারণে সংকট তৈরি হয়েছে, তাঁদের দায় নিশ্চিত করা যাবে কীভাবে?
ব্যাংক উদ্ধারের মূল্য কত?
প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা মানে পাঁচ বছরে ৩ লাখ কোটি টাকা, আর আট বছরে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থের বিকল্প ব্যবহার নিয়ে গভর্নর নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বছরে এই অর্থ দিয়ে দুই কোটি পরিবারকে পারিবারিক কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা করা যেত, অথবা দুটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব হতো।
তুলনাটি কেবল অর্থের পরিমাণ বোঝানোর জন্য নয়; বরং রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদ ব্যবহারের প্রশ্নটিও সামনে আনে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়নে যেখানে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, সেখানে ব্যাংক খাতের ক্ষতি মেটাতে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হলে অন্য খাতের বরাদ্দে চাপ পড়তে পারে। রাজস্ব আদায় বাড়ানো বা নতুন ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন হলে তার প্রভাবও শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির বিভিন্ন অংশে পড়বে।
তবে ব্যাংককে সহায়তা করা মানেই অর্থের অপচয়—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে আমানতকারী, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই ক্ষতি ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই পুনরুদ্ধারের ব্যয়, শর্ত ও জবাবদিহি কী হবে, সেটিই আসল প্রশ্ন।
লুটের দায়, করদাতার ঘাড়ে কেন?
গভর্নরের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ ও লুটপাট থেকেই বর্তমান সংকটের সূত্রপাত। এখন গ্রাহকদের টাকা পরিশোধে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে অর্থ সরবরাহ করা হচ্ছে, যার উৎস জনগণের করের টাকা। অর্থাৎ যাঁরা ব্যাংকের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন, তাঁরাও রাষ্ট্রীয় অর্থের মাধ্যমে সংকট সামাল দেওয়ার ব্যয় বহন করছেন।
এখানে একটি ন্যায্যতার প্রশ্ন আছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ করে থাকলে তার দায় কেন সাধারণ করদাতার ওপর বর্তাবে? রাষ্ট্রের দায়িত্ব আমানতকারীদের সুরক্ষা দেওয়া, কিন্তু সেই দায়িত্বের আড়ালে দায়ী ব্যক্তিদের দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করা নয়।
এ জন্য ব্যাংক পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনায় অর্থের প্রয়োজন নির্ধারণের পাশাপাশি ক্ষতির উৎস চিহ্নিত করা, আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধার, দায়ী ব্যক্তিদের সম্পদ শনাক্ত ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কত টাকা উদ্ধার করা সম্ভব, কত টাকা অনাদায়ি থেকে যেতে পারে এবং বাজেট থেকে কতটা সহায়তা অপরিহার্য—এসব হিসাবও জনগণের সামনে প্রকাশ করা দরকার।
ঋণ পুনর্গঠন, নাকি দায় এড়ানোর সুযোগ?
গভর্নর জানিয়েছেন, ঋণদাতা ব্যাংক ও ঋণখেলাপিদের আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের জন্য ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। ২০২৭ সাল থেকে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এ লক্ষ্যে দুটি আইন সংশোধন এবং অর্থ পাচার প্রতিরোধের নিয়ম আরও কঠোর করার কথাও বলেছেন তিনি।
ঋণ পুনর্গঠন ব্যবসা সচল রাখা, কর্মসংস্থান রক্ষা এবং আদায়যোগ্য অর্থ ফেরত আনার কার্যকর উপায় হতে পারে। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করা এবং সাময়িক ব্যবসায়িক সংকটে পড়া—এই দুই পরিস্থিতিকে এক করে দেখলে চলবে না। একইভাবে, ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানোর সুযোগ যেন প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের দায় এড়ানোর হাতিয়ার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতা না থাকলে নতুন বিধানও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। ঋণ অনুমোদন, জামানত মূল্যায়ন, অর্থের ব্যবহার এবং ঋণ আদায়ে যাঁদের দায়িত্ব ছিল, তাঁদের ভূমিকাও পর্যালোচনার আওতায় আনা প্রয়োজন। শুধু ঋণগ্রহীতাকে শাস্তি দিলেই ব্যাংকের ভেতরের দুর্বলতা দূর হবে না।
পুনরুদ্ধারের সঙ্গে জবাবদিহিও চাই
ব্যাংক খাতকে সুস্থ করা দীর্ঘমেয়াদি কাজ। এ জন্য বাজেট সহায়তা প্রয়োজন হলে তার ভিত্তি, সীমা ও ফলাফল নির্ধারণ করতে হবে। কোন ব্যাংক কত অর্থ পাচ্ছে, কেন পাচ্ছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কী অগ্রগতি দেখাতে হবে—এসব শর্ত প্রকাশ করা উচিত। নিয়মিত স্বাধীন নিরীক্ষা এবং সংসদ ও জনগণের কাছে ব্যয়ের হিসাব দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকা দরকার।
একই সঙ্গে আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারে দৃশ্যমান অগ্রগতি, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত ঋণ অনুমোদন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা ও তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর না হলে নতুন অর্থও পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।
ব্যাংক খাতের পুনরুদ্ধার তাই শুধু টাকা জোগানোর হিসাব নয়; এটি আস্থা ফেরানোর পরীক্ষা। জনগণের অর্থ দিয়ে ব্যাংককে বাঁচানো হলে জনগণকে জানতে হবে সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কার দায় কতটুকু এবং ভবিষ্যতে একই ঘটনা ঠেকাতে কী বদল আনা হচ্ছে। ব্যাংক উদ্ধার হতে পারে রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই, কিন্তু সেই উদ্ধারের নামে দায়ীদের দায় আড়াল করা হলে সংকটের মূল্য শেষ পর্যন্ত আরও বেশি দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
লেখক: বিজনেস এডিটর, দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ।
সাবেক কর্মস্থল: দৈনিক যায়যায়দিন, বর্তমান, দেশ রূপান্তর ও দৈনিক ইত্তেফাক।
পাঠকের মন্তব্য