![]()
ইরান যুদ্ধ তৃতীয় মাসে গড়ানোর পর বৈশ্বিক সামরিক বিশ্লেষকদের নজর এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বরং সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-চীন সংঘাতের দিকেও। বিশেষ করে এই যুদ্ধ থেকে বেইজিং কী শিক্ষা নিচ্ছে, তা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
সিএনএন চীন, তাইওয়ান ও অন্যান্য অঞ্চলের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরের চলমান সংঘাত ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সংঘর্ষের সম্ভাব্য চিত্র বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—যুদ্ধক্ষেত্রে ফলাফল শুধু নিজের শক্তির ওপর নির্ভর করে না; প্রতিপক্ষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের জন্য বড় সতর্কবার্তা
চীনের বিমানবাহিনীর সাবেক কর্নেল ফু কিয়ানশাও বলেন, ইরান যুদ্ধ দেখিয়েছে যে কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে অবহেলা করা যাবে না।
তার মতে, ইরান অপেক্ষাকৃত স্বল্পমূল্যের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেও মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেমন প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেম ও থাডকে ফাঁকি দেওয়ার উপায় খুঁজে পেয়েছে।
তিনি বলেন, “ভবিষ্যতের যুদ্ধে অপরাজিত থাকতে হলে আমাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা খুঁজে বের করতে হবে।”
আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে চীন
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পিপলস লিবারেশন আর্মি বা পিএলএ দ্রুত আধুনিকায়নের পথে এগিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখন এমন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি উন্নয়ন করছে, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটর তথ্যমতে, চীন অন্তত এক হাজার চেংদু জে-২০ স্টেলথ ফাইটার মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে, যেগুলোকে মার্কিন এফ-৩৫ লাইটনিং II-এর সমকক্ষ হিসেবে দেখা হয়।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্পিরিট ও বি-২১ রেইডার-এর মতো দূরপাল্লার স্টেলথ বোমারু বিমান তৈরির কাজও চালিয়ে যাচ্ছে বেইজিং।
ড্রোন যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—স্বল্পমূল্যের ড্রোনের কার্যকারিতা।
ইরানের ব্যবহৃত শাহেদ ড্রোন তুলনামূলক কম প্রযুক্তির হলেও মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও গাইডেড বোমা ব্যবহার করে ইরানের অবকাঠামো, নৌযান, সেতু ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।
ফু কিয়ানশাওর মতে, এই “মিশ্র যুদ্ধকৌশল” মোকাবিলায় চীনকে নিজেদের বিমানঘাঁটি, বন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় নতুনভাবে ভাবতে হবে।
তাইওয়ান ইস্যুতে বাড়ছে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সংঘাতের সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবে বরাবরের মতোই উঠে আসছে তাইওয়ান।
যদিও দ্বীপটি কখনো শাসন করেনি, তবু চীনা কমিউনিস্ট পার্টি তাইওয়ানকে “পুনরেকত্রীকরণ”-এর অঙ্গীকার করে আসছে। প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিতও দিয়েছেন শি জিনপিং।
তাইওয়ানের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি রিসার্চের গবেষক চিহ চুং বলেন, চীনের সম্ভাব্য সামরিক অভিযানে দূরপাল্লার রকেট ও “ড্রোন সোয়ার্ম” বড় ভূমিকা রাখবে।
বছরে ১ বিলিয়ন অস্ত্রবাহী ড্রোন?
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম War on the Rocks-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের বেসামরিক শিল্প খাত চাইলে বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন অস্ত্রবাহী ড্রোন উৎপাদন করতে পারে।
এই বিপুল সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে তাইওয়ানে। দেশটির সরকারি পর্যবেক্ষণ সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাইওয়ানের বর্তমান ড্রোন-প্রতিরোধী ব্যবস্থা এখনো দুর্বল।
তবে তাইওয়ানও নিজেদের প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে। দেশটির ড্রোন নির্মাতা Thunder Tiger-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিন সু আরও বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রও শিখছে
ইরান যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রও নতুন শিক্ষা নিচ্ছে।
এপ্রিল মাসে মার্কিন সিনেটে শুনানিতে স্যামুয়েল পাপারো বলেন, ড্রোন যুদ্ধ আক্রমণকারী পক্ষের ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
তার মতে, তাইওয়ান প্রণালিতে যুদ্ধ হলে ড্রোন ব্যবহার করে চীনা যুদ্ধজাহাজ ও পরিবহন বিমানকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হতে পারে।
তিনি এমনকি তাইওয়ান প্রণালিতে হাজার হাজার ড্রোন মোতায়েনের প্রস্তাবও দেন, যাতে পিএলএ সেনাদের অগ্রযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে।
যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় পিছিয়ে চীন
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের বড় দুর্বলতা হলো যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাব।
১৯৭৯ সালে চীন-ভিয়েতনাম যুদ্ধর পর পিএলএ আর কোনো বড় যুদ্ধে অংশ নেয়নি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধসহ বিভিন্ন সংঘাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
সিঙ্গাপুরের এস রাজরত্নম স্কুলের জ্যেষ্ঠ ফেলো ড্রু থম্পসন কোরীয় যুদ্ধের উদাহরণ দিয়ে বলেন, “একটি সাধারণ বিমানে থাকা দক্ষ পাইলট প্রায়ই অত্যাধুনিক বিমানে থাকা অনভিজ্ঞ পাইলটকে হারিয়ে দেয়।”
বিশ্ববাণিজ্যের ঝুঁকি
ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসিস-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রেইগ সিঙ্গেলটন বলেন, ইরান দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে একটি আঞ্চলিক সংঘাত দ্রুত বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করতে পারে।
তার মতে, তাইওয়ানকে ঘিরে সংঘাত শুরু হলে সেটিও বিশ্ববাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।
পাঠকের মন্তব্য