
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি জোরদার করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সরকারের পরামর্শ অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ—এই পাঁচ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন ধাপে ধাপে আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য সূচনা সময় হিসেবে আগামী ডিসেম্বরকে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে কোন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আগে হবে এবং ভোটের সুনির্দিষ্ট তারিখ কবে নির্ধারণ করা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি এবং অর্থ বিভাগের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়ের পর ভোটের সময়সূচি চূড়ান্ত হতে পারে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রায় দুই হাজার ৯০০ কোটি, উপজেলা পরিষদে প্রায় দুই হাজার কোটি, সিটি করপোরেশনে প্রায় ৩৩০ কোটি এবং পৌরসভা নির্বাচনে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। জেলা পরিষদ নির্বাচনের ব্যয় যুক্ত হলে মোট খরচ ছয় হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি যেতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ে ইসি-আইজিপির বৈঠক
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বৈঠক করেন।
বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বয় সেল গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়। সিইসি জানিয়েছেন, দ্রুতই এই সমন্বয় সেল গঠন করা হবে। এতে সশস্ত্র বাহিনীসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিরা থাকবেন।
আইজিপিও জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সমন্বয় সেল গঠন নিয়ে সিইসির সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
পাঁচ প্রতিষ্ঠানে ধাপে ধাপে ভোট
ইসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে নির্বাচন উপযোগী রয়েছে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং ৬১টি জেলা পরিষদ। এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন ধাপে ধাপে আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে কোনো প্রার্থীকে জিতিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকবে না বলেও দলীয় নেতাকর্মীদের জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরের মধ্যেই পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা বাজেট ধরা হয়েছে। অর্থ বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়ের পর কোন নির্বাচন আগে হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।
দলীয় প্রতীক ছাড়াই ভোট
এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও মেয়র পদে দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে সরকার। দলীয়ভাবে কোনো প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ থাকবে না বলেও জানানো হয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের পাশাপাশি প্রকৃত অর্থে নির্দলীয় নির্বাচন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, দলীয় প্রভাবমুক্ত নির্বাচন হলে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির জনপ্রিয় ব্যক্তিরাও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
তবে নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, অতীতেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনত নির্দলীয় থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন ও প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব হয়নি। এবারও কয়েকটি রাজনৈতিক দল তাদের সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। ডিসেম্বর থেকে ভোট শুরুর সম্ভাবনা থাকলেও অর্থ ছাড়, প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে ভোটের প্রকৃত সময়সূচি। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত প্রস্তুতিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পাঠকের মন্তব্য