![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে জ্বালানি সংকটের সুযোগ কাজে লাগিয়ে এশিয়াজুড়ে নিজের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত করছে চীন। যুদ্ধের কারণে যখন তেল, ডিজেল, জেট ফুয়েল ও সার সরবরাহে ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তখন বেইজিং নিজেকে আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভরসা হিসেবে তুলে ধরছে।
বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে বিশাল জ্বালানি মজুত গড়ে তুলেছে চীন। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সোলার প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং উইন্ড এনার্জিতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করে নিজেদের বিকল্প শক্তির ভিত্তিও শক্তিশালী করেছে দেশটি। ফলে ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এখন জ্বালানি সহায়তার জন্য বেইজিংয়ের দ্বারস্থ হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান যখন হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে, তখন পুরো এশিয়ায় জ্বালানি সরবরাহ চেইনে বড় ধাক্কা লাগে। এ সময় চীন কৌশলগতভাবে জ্বালানি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে আনে। এর ফলে যেসব দেশ চীনের শোধনাগারের জেট ফুয়েল, পেট্রল ও ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা বড় সংকটে পড়ে যায়।
তবে একইসঙ্গে চীন বাছাইকৃত কয়েকটি দেশকে জ্বালানি সহায়তা দিয়ে আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে সম্ভাব্য জেট ফুয়েল সংকট মোকাবিলায় বেইজিংয়ের কাছে সহায়তা চেয়েছে। ফিলিপাইন চীনের কাছে সার রপ্তানি সীমিত না করার অনুরোধ জানিয়েছে। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীও সম্প্রতি বেইজিং সফর করে জ্বালানি সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখন শুধু তেল বা জ্বালানি সরবরাহকারী নয়, বরং ‘এনার্জি পাওয়ারহাউস’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তারা একদিকে সংকটকবলিত দেশগুলোকে জ্বালানি সহায়তা দিচ্ছে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করছে।
অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের গবেষক মিশাল মেইদান বলেন, “চীন অত্যন্ত হিসাব করে তার প্রতিবেশীদের সহায়তা করছে। এটি মূলত সফট পাওয়ার কূটনীতির অংশ। ভবিষ্যতে গ্রিন টেকনোলজি রপ্তানির ভিত্তি তৈরি করতেই তারা এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে।”
যুদ্ধের পর থেকে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছে বেইজিং। এসব আলোচনায় চীন বারবার একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে— তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধের পক্ষে নয়, তবে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প সমাধান তাদের কাছে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন তেল ও গ্যাসভিত্তিক জ্বালানি নীতিতে জোর দিচ্ছেন, তখন চীন নিজেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি-নির্ভর ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে তুলে ধরছে। এর মাধ্যমে বেইজিং শুধু অর্থনৈতিক সুবিধাই নয়, ভূরাজনৈতিক প্রভাবও বাড়াতে চাইছে।
ইউরেশিয়া গ্রুপের চীনবিষয়ক পরিচালক ড্যান ওয়াং বলেন, “চীন খুব বেছে বেছে জ্বালানি সহায়তা দিচ্ছে। যেসব দেশের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো, তারাই বেশি সুবিধা পাচ্ছে।”
বিশেষ করে ভিয়েতনাম ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতির পর দেশ দুটি চীনের কাছ থেকে জরুরি জ্বালানি সহায়তা পেয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে তাইওয়ানের ক্ষেত্রে চীন রাজনৈতিক বার্তাও দিয়েছে। বেইজিংয়ের তাইওয়ানবিষয়ক দফতর ইঙ্গিত দিয়েছে, শান্তিপূর্ণ পুনঃএকত্রীকরণ হলে তাইওয়ানের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে চীন বৈশ্বিক বাজারে সোলার প্যানেল, উইন্ড টারবাইন, স্মার্ট গ্রিড এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির রপ্তানিও বাড়িয়েছে। মার্চের তুলনায় এপ্রিল মাসে দেশটির সোলার প্যানেল রপ্তানি দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এশিয়ার জ্বালানি নির্ভরতার দুর্বলতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। আর এই সংকটের মধ্যেই চীন নিজেকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বিকল্প জ্বালানির প্রধান অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।